ইসলামী জীবনধারায় কর্মব্যস্ততার পাশাপাশি বিশ্রাম ও বিনোদনেরও গুরুত্ব রয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে বার্ষিক ছুটির প্রচলন থাকলেও, ইসলাম এই সময়কে সঠিক নিয়ত ও পরিকল্পনার মাধ্যমে মানসিক শক্তি পুনরুদ্ধারে ব্যবহারের নির্দেশ দেয়। সাহাবি হজরত হানজালা (রা.) একবার নবীজির কাছে আফসোস করে বলেছিলেন যে রাসুলের দরবারে থাকার সময় পরকালের যে ব্যাকুলতা তিনি অনুভব করেন, সংসারে ফিরে তা কমে যায়। উত্তরে মহানবী (সা.) জানান, সব সময় একই অবস্থা বজায় রাখা সম্ভব নয়; জীবনের জন্য কাজের পাশাপাশি বিশ্রামের সময়ও প্রয়োজন। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৭৫০) অপর হাদিসে ঈদের দিনে মসজিদের চত্বরে খেলাধুলার অনুমতি দিয়ে নবী (সা.) বলেছিলেন, ইহুদিরা যেন জানে যে ইসলামেও অবকাশ ও প্রশান্তির সুযোগ রয়েছে। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ২৪৮৫৫) আল্লামা ইবনে আশুরের মতে, ক্লান্তি দূর করা এবং মনকে সতেজ করার জন্য বিনোদন বৈধ, যতক্ষণ না তা অভ্যাসে পরিণত হয়ে কর্মবিমুখ করে তোলে। (আত-তাহরির ওয়াত-তানভির, ১২/৩৯)
ছুটির সময়কে অর্থবহ করতে আটটি দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রথমত, বিনোদন যেন পাপের পথে না নিয়ে যায়। ইসলাম বৈধ উপায়ে আনন্দের বিপুল সুযোগ রেখেছে। কোরআনে বলা হয়েছে, “বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যেসকল শোভাবর্ধক বস্তু ও উত্তম জীবিকা সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?” (সুরা আ’রাফ, আয়াত: ৩২) দ্বিতীয়ত, নামাজে গাফিলতি না করা। ছুটি মানে ইবাদত থেকে ছুটি নয়। ভ্রমণের সময়ও নির্দিষ্ট সময়ে নামাজ আদায় করতে হবে, কারণ চরম যুদ্ধাবস্থায়ও নামাজ ত্যাগের অনুমতি ইসলাম দেয়নি। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৩৮-২৩৯) তৃতীয়ত, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও পরিকল্পনা রাখা। পরিকল্পনা ছাড়া ছুটি সময়ের অপচয়। নবী (সা.) হিজরতের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। চতুর্থত, মনের প্রশান্তির মাধ্যম খুঁজে নেওয়া। সব মানুষের বিনোদনের ধরন এক নয়; কেউ প্রকৃতিতে, কেউ পরিবারের সাথে সময় কাটিয়ে আনন্দ পান। নিজের ব্যক্তিত্বের সাথে মেলে এমন সুস্থ বিনোদন বেছে নেওয়া উচিত। পঞ্চমত, ভালো সঙ্গী নির্বাচন। সৎ সঙ্গী যেমন ভালো কাজে উৎসাহিত করে, অসৎ সঙ্গ পুরো ভ্রমণ নষ্ট করতে পারে। নবী (সা.) বলেছেন, “সৎ সঙ্গী যেন সুগন্ধি বিক্রেতার মতো, যে নিজে না দিলেও তার কাছ থেকে সুবাস পাওয়া যায়।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২১০১) ষষ্ঠত, লক্ষ্য অনুযায়ী সঠিক সময় নির্বাচন। যেমন ওমরাহ পালনের জন্য রমজান বা জিলহজ মাস সেরা সময়। ইবনুল কাইয়িম (রহ.) বলেছেন, আল্লাহর রাস্তায় শক্তি অর্জনের নিয়তে আহার, নিদ্রা ও বিশ্রাম ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। (মাদারিজুস সালিকিন, ২/২১৬) সপ্তমত, উপযুক্ত স্থান নির্বাচন। মানসিক প্রশান্তি চাইলে কোলাহলমুক্ত স্থান, আর মেলামেশা চাইলে জনবহুল সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বেছে নেওয়া যেতে পারে। অষ্টমত, নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়। ছুটি শেষে নিরাপদে ফিরতে পারলে আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। কোরআনে বলা হয়েছে, “তোমাদের কাছে যেসকল নেয়ামত রয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৫৩)
পরিশেষে, ছুটি বা অবকাশ অপচয় বা অলসতার সময় নয়; বরং এটি জীবনের ক্লান্তি দূর করে নতুন উদ্দীপনায় কাজে ফেরার সুযোগ। সঠিক পরিকল্পনা, নৈতিকতার ভারসাম্য ও ভালো নিয়ত থাকলে ছুটির প্রতিটি মুহূর্ত মানসিক প্রশান্তি ও সওয়াবের মেলবন্ধনে পরিণত হতে পারে।




