সাহাবিদের জীবনধারা বিশ্লেষণ করলে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে—তাদের জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং সত্যকে জানার ব্যাকুলতা। তাই তারা নিয়মিত নবীজির কাছে প্রশ্ন উপস্থাপন করতেন। পরকালের মুক্তি, সমাজের ঐক্য এবং দুনিয়ার জীবনে সঠিক পথ খুঁজে পেতে তারা প্রায়ই নবীজির দ্বারস্থ হতেন। তাদের এই কৌতূহল নিছক ঐতিহ্যবাহী জিজ্ঞাসা ছিল না; বরং তা ছিল আত্মশুদ্ধি, নৈতিক অনুশীলন এবং দ্বীন শেখার একটি সুনির্দিষ্ট, বাস্তবমুখী পদ্ধতি। অজ্ঞতায় নিমজ্জিত না থেকে প্রশ্ন করে জেনে নেওয়া শুধু একটি শিষ্টাচারই নয়, বরং জীবনের নিরাপত্তার জন্য অপরিহার্য একটি সুন্নত হিসেবে বিবেচিত।
অজ্ঞতার প্রতিষেধক হিসেবে প্রশ্ন করাকে ইসলামে চিহ্নিত করা হয়েছে। জাবের ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঐতিহাসিক ঘটনায় দেখা যায়, এক সফরে এক সাহাবির মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। পরবর্তীতে তার গোসলের প্রয়োজন হলে তিনি সঙ্গীদের জিজ্ঞেস করেন তায়াম্মুম করার সুযোগ আছে কিনা। সঙ্গীরা না জেনেই বলেছিলেন, পানি থাকা অবস্থায় তায়াম্মুম জায়েজ নয়। ফলে তিনি গোসল করতে বাধ্য হন এবং ক্ষতস্থানে পানি পড়ায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। খবর পেয়ে নবীজি অত্যন্ত ব্যথিত হয়ে বলেন, ‘তারা লোকটিকে মেরেই ফেলল! আল্লাহ তাদের বিনাশ করুন। তারা যখন জানত না, তখন জিজ্ঞেস করল না কেন? কারণ, না জানার একমাত্র মহৌষধ হলো প্রশ্ন করা। লোকটির জন্য তো তায়াম্মুম করাই যথেষ্ট ছিল।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ৩৩৬)
পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন, ‘সুতরাং তোমরা যদি না জানো, তবে জ্ঞানীদের (আহলে জিকির) জিজ্ঞাসা করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৪৩) সাহাবিরা এই ঐশী নির্দেশনাকে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের মূলনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। চতুর্থ খলিফা আলী (রা.) তার অগাধ জ্ঞানের রহস্য ব্যাখ্যা করে বলতেন, ‘আল্লাহর কসম, প্রতিটি আয়াত কোথায়, কাদের সম্পর্কে এবং কেন নাজিল হয়েছে তা আমি জানি; কারণ, আমার প্রতিপালক আমাকে একটি অনুধাবনকারী অন্তর ও অনুসন্ধিৎসু জিহ্বা দান করেছেন।’ (হিলইয়াতুল আউলিয়া, ১/৬৮) একইভাবে আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাসকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন, ‘বারবার প্রশ্নকারী মুখ আর সত্য অনুধাবনক্ষম তীক্ষ্ণ হৃদয়ের মাধ্যমে।’ (বাইহাকি, আল-মাদখাল, ২/৭০৮) আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেছেন, ‘উপযুক্ত প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই মূলত জ্ঞানের পূর্ণতা অর্জিত হয়।’ (জামিউ বায়ানিল ইলমি, ১/৩৭৪)
সাহাবিরা নবীজিকে প্রশ্ন করার সময় অহেতুক জটিলতা বা বাকচাতুরী এড়িয়ে চলতেন। তাদের প্রশ্ন ছিল বাস্তবমুখী। নারীরাও ধর্মের সংবেদনশীল বিষয়ে প্রশ্ন করতে দ্বিধা করতেন না। আয়েশা (রা.) আনসারি নারীদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আনসারি নারীরা কতই না উত্তম! ধর্মীয় সঠিক জ্ঞান অর্জনে লজ্জা তাদের কখনো বাধা দিতে পারেনি।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৩০) তবে কোরআনে অপ্রয়োজনীয়, কাল্পনিক বা উসকানিমূলক প্রশ্ন করতে নিষেধ করা হয়েছে। (সুরা মায়েদা, আয়াত: ১০১) তাই সাহাবিরা শুধু নিজেদের জীবন সংশোধন ও আমলি ফায়দার জন্যই প্রশ্ন করতেন।
সংক্ষিপ্ত প্রশ্নের জবাবে নবীজি সব সময় ‘জাওয়ামিউল কালেম’ বা অল্প কথায় গভীর অর্থবোধক বাক্যে নির্দেশ দিতেন। কেউ সফল হওয়ার উপদেশ চাইলে তিনি বলতেন, ‘তুমি বলো—আমি আল্লাহর প্রতি ইমান এনেছি, তারপর তার ওপর অটল ও অবিচল থাকো।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৩৮) চারিত্রিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন করলে নির্দেশ ছিল, ‘তুমি রাগ কোরো না।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৬) সমাজসেবা শেখাতে গিয়ে অপর এক সাহাবিকে বলেন, ‘তুমি মুসলিমদের যাতায়াতের সাধারণ পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দাও।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৬১৮) সাহাবিদের এই প্রশ্নভিত্তিক জ্ঞানচর্চা প্রমাণ করে ইসলাম নিছক তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, বরং দৈনন্দিন অনুশীলনের রূপরেখা। আধুনিক যুগের বিভ্রান্তি ও দ্বিধা থেকে মুক্তি পেতে সাহাবিদের মতো সত্য অন্বেষণের মানসিকতা এবং প্রশ্ন করার এই সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা জরুরি।




