মুসলিম স্থাপত্য ও নগর পরিকল্পনার ইতিহাস আলোচনায় প্রায়শই প্রাসাদ, দুর্গ, মসজিদ বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর কথাই বেশি উঠে আসে। অথচ সভ্যতার প্রকৃত প্রাণস্পন্দন লুকিয়ে থাকে সাধারণ মানুষের বসতবাড়ি ও দৈনন্দিন আবাসনের কাঠামোর মধ্যে। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার প্রাচীন শহরগুলোর গলিপথ ধরে হাঁটলে আজও যে অনন্য স্থাপত্যশৈলী চোখে পড়ে, তা ছিল মূলত সাধারণ ও মধ্যবিত্ত মানুষের প্রয়োজন, পারিবারিক গোপনীয়তা, আবহাওয়া ও সামাজিক মূল্যবোধের এক চমৎকার সমন্বয়।

ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রধান স্থপতিদের ‘উস্তাদ’ উপাধিতে ভূষিত করা হতো, যা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতো স্থাপত্যশিল্পের উচ্চ মর্যাদা প্রমাণ করে। একজন সাধারণ নাগরিকের বাড়ি কেমন হবে, তার নকশা কীভাবে নির্ধারিত হবে এবং আলো-বাতাসের ব্যবস্থা কীভাবে বজায় রাখা হবে—তা শুধু একটি ভৌত নির্মাণ ছিল না; বরং তা ছিল ইসলামি জীবনধারা ও প্রতিবেশীদের পারস্পরিক অধিকারের এক বাস্তব প্রতিফলন।

ইসলাম-পূর্ব আরব সমাজে এবং মরু অঞ্চলের জীবনধারায় স্থায়ী বাড়িঘরের চেয়ে তাঁবু বা চামড়া ও পশমের তৈরি সাময়িক বাসস্থানের ব্যবহারই বেশি ছিল। পবিত্র কোরআনে সেই সরল ব্যবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তোমাদের ঘরগুলো তোমাদের জন্য স্থায়ী বসবাসের স্থান করেছেন এবং তিনি পশুর চামড়া দিয়ে তোমাদের জন্য বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছেন।” (সুরা নাহল, আয়াত: ৮০) পরবর্তী সময়ে মক্কা ও মদিনায় স্থায়ী জনবসতি গড়ে উঠলেও নবীযুগে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ির রূপ ছিল খুবই সাধারণ। নবীজির মদিনার হুজরাগুলো ছিল খেজুরের ডাল, পাতা ও কাঁচা মাটির তৈরি। ঐতিহাসিক ইবনে সাদ বর্ণনা করেছেন, নববী হুজরার কয়েকটি ছিল কাঁচা-ইটের এবং কয়েকটি খেজুরগাছের ডালের তৈরি, যার দরজায় পশমের পর্দা ঝুলত।

মুসলিম সাম্রাজ্যের বিস্তৃতির সঙ্গে নগর গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেয়। ঐতিহাসিক ইবনে খালদুন ইমারত নির্মাণকে মানব সভ্যতার প্রথম ও প্রাচীনতম মৌলিক শিল্প হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেছেন, যা মানুষকে প্রাকৃতিকভাবে আশ্রয় ও নিরাপত্তা দেয়। মুসলিম সভ্যতায় বাড়িঘর নির্মাণের পেছনে কাজ করতেন পেশাদার কারিগরদের এক বিশাল দল। এই দলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, রাজমিস্ত্রি, নকশাকার, প্লাস্টারশিল্পী ও সাধারণ শ্রমিক বা ‘রুজগারি’। ইরাক ও মিসরে প্রধান প্রকৌশলীকে বলা হতো ‘উস্তাদ’ বা ‘রইসুল মুহান্দিসিন’। নির্মাণকাজে আধুনিক স্কেল বা থ্রি-ডি মডেলিংয়ের মতো প্রাথমিক রূপও তখন ব্যবহৃত হতো। খলিফা আল-মানসুর বাগদাদ শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন। তিনি প্রকৌশলীদের ডেকে মাটিতে তুলার বীজের ওপর তেলের ফোঁটা ফেলে আগুন জ্বালিয়ে পুরো শহরের একটি দৃশ্যমান প্রাথমিক রেখাচিত্র বা থ্রি-ডি মডেল তৈরি করে দেখে নিয়েছিলেন।

বাড়ি নির্মাণের খরচ মালিকের সামর্থ্য অনুযায়ী নির্ধারিত হতো। মিসর বা দামেস্কে সাধারণ একটি দোতলা বাড়ির গড় খরচ ছিল তিন শত থেকে এক হাজার দিনার। তবে বাড়ি নির্মাণের সময় যাতে প্রতিবেশীর আলো-বাতাস বা গোপনীয়তা বিনষ্ট না হয়, সে বিষয়ে কাজিরা প্রকৌশলীদের মতামত গ্রহণ করতেন। মুসলিম ঘরবাড়ির নকশা মূলত দুটি মূল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে ছিল—পারিবারিক গোপনীয়তা রক্ষা এবং ভেতরের পরিবেশ ঠান্ডা রাখা। বাইরের দরজা খুললেই ভেতরের ঘর দেখা যেত না। মাঝখানে থাকত একটি বাঁকানো গলি বা প্রবেশপথ, যাকে বলা হতো ‘দেহলিজ’। দেহলিজ পার হলেই পাওয়া যেত বাড়ির কেন্দ্রস্থলে খোলা উঠান, যাকে বলা হয় ‘সাহন’। উঠানের চারপাশে ঘরের দরজাগুলো খুলত। উঠানে ফোয়ারা, ছোট পানির হাউজ বা গাছপালা থাকত যা পুরো বাড়িকে ঠান্ডা রাখত। অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য ব্যবহৃত হতো ‘মজলিস’, শোবার ঘরকে বলা হতো ‘মারকাদ’, আর উচ্চবিত্ত ও আলেমদের বাড়িতে থাকত ‘বাইতুল কুতুব’ বা নিজস্ব লাইব্রেরি। বাড়ির ওপরের অংশে কাঠ দিয়ে তৈরি করা হতো ছোট ঘর বা চিলেকোঠা, যাকে বলা হতো উম্মু আল-গুরফ বা আলিয়্যাহ।

গরম প্রধান অঞ্চলে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ঘর ঠান্ডা রাখার চমৎকার প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছিলেন তৎকালীন প্রকৌশলীরা। বাড়ির ছাদের ওপর বিশেষ ধরনের টাওয়ার বা উইন্ডক্যাচার তৈরি করা হতো, যা ওপরের ঠান্ডা বাতাসকে টেনে নিচে নামিয়ে আনত, যাকে বলা হতো বাদাহাঞ্জ। গ্রীষ্মকালে জানালা ও উইন্ডক্যাচারের মুখে সুতি বা পাটের ভিজা পর্দা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো, যার মধ্য দিয়ে বাতাস ঘরে ঢোকার সময় প্রাকৃতিকভাবে পরিবেশ শীতল হয়ে যেত। ঘরের সাহনে ছোট ফোয়ারা নির্মাণ করা হতো। দামেস্কের কিছু বাড়িতে দেখা যেত পানির নালা রান্নাঘর থেকে সরাসরি খাবার ঘরে খাবার ভর্তি পাত্র ভাসিয়ে নিয়ে আসত। এছাড়া প্রতিটি বাড়ির নিচে বৃষ্টির পানি জমা রাখার জন্য সুনির্দিষ্ট আধার নির্মাণ করা হতো।

মুসলিম সভ্যতায় বহুতল ভবন ও যৌথ আবাসনের ধারণা বেশ প্রাচীন। মদিনায় সাহাবি সাদ ইবনে খাইসামার বাড়িটি ‘বাইতুল উজ্জাব’ বা ব্যাচেলরদের বাড়ি নামে পরিচিত ছিল, কারণ সেখানে হিজরত করে আসা অবিবাহিত সাহাবিরা থাকতেন। পরবর্তী সময়ে কায়রো, ত্রিপোলি ও জেদ্দায় ৫ থেকে ৭ তলা পর্যন্ত উঁচু আবাসিক ভবন নির্মিত হয়েছিল। কায়রোতে এক একটি বহুতল ভবনে ছোট ছোট ফ্ল্যাট বা ‘মাসরিয়্যাত’ থাকত, যেখানে এক একটি ভবনে প্রায় তিন শতাধিক মানুষ বাস করতেন বলে ভ্রমণকারী নাসের খসরু উল্লেখ করেছেন।

মুসলিম সভ্যতায় মানুষের বাসস্থান শুধু ইট-পাথরের দেওয়াল ছিল না; তা ছিল আত্মিক প্রশান্তি, সৌন্দর্য ও সামাজিক নিরাপত্তার এক অনন্য আশ্রয়। প্রযুক্তি ও প্রকৃতির সঠিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে যেভাবে সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি তৈরি করা হতো, তা হতে পারে বর্তমান যুগের পরিবেশবান্ধব ও টেকসই আবাসন ব্যবস্থার জন্য এক অন্যতম অনুপ্রেরণা।