প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে বন্যপ্রাণীর আচরণে। মধ্য আমেরিকার দেশ পানামার রাজধানী পানামা সিটির আকাশে সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে শত শত সামুদ্রিক পাখির চক্কর। শহরবাসীর জন্য এটি এক ব্যতিক্রমী ও বিরল দৃশ্য, কেননা দেশটির উপকূলীয় এলাকায় সাধারণত এ প্রজাতির পাখি দেখা যায় না। বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, লাতিন আমেরিকার চিলি ও পেরু থেকে এসেছে এই অতিথি পাখির দল।

তাদের এই অপ্রত্যাশিত স্থানান্তরকে গবেষকরা কেবল একটি স্থানীয় ঘটনা হিসেবে দেখছেন না; বরং এটি বৃহত্তর পরিবেশগত সংকটের পূর্বাভাস বলে মনে করা হচ্ছে। পাখিগুলোর এলাকা বদলের পেছনে একটিমাত্র কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে শক্তিশালী এল নিনো।

এই প্রাকৃতিক ঘটনাটি প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্বাংশের পানির তাপমাত্রাকে অস্বাভাবিক মাত্রায় উষ্ণ করে তুলেছে। ফলে সেখানকার সামুদ্রিক মাছের দল খাদ্য সংগ্রহের জন্য সাগরের অন্য এলাকায় সরে যেতে বাধ্য হচ্ছে। যেহেতু ওই মাছগুলোই এই সামুদ্রিক পাখিদের প্রধান খাদ্য উৎস, তাই খাবারের অভাবে পাখিরাও নিজেদের চেনা বসতি ছেড়ে দূরবর্তী স্থানে চলে আসছে।

এল নিনো আসলে একটি স্বাভাবিক চক্র, যেখানে নির্দিষ্ট সময় অন্তর প্রশান্ত মহাসাগরের পৃষ্ঠের পানির তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বেড়ে যায়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং আবহাওয়ার ধরনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। চলতি বছরের আগস্ট মাস থেকে এই প্রভাব আরও তীব্র হতে পারে বলে জাতিসংঘ আগেই পূর্বাভাস দিয়েছিল।

পাখি পর্যবেক্ষণ ও সংরক্ষণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহকারী প্ল্যাটফর্ম ই–বার্ডের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন মাস থেকে পানামা সিটির কাছে পেনন সে সান হোসে ও এর আশপাশের এলাকায় ৬০ থেকে ৪০০টি ‘ব্লু ফুটেড বুবি’ পাখি রেকর্ড করা হয়েছে। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৪ থেকে ২০১৬ সালের এল নিনোর সময় সেখানে এই সংখ্যা ছিল ২১ থেকে ২০০টি। আবার ২০২৩–২৪ সালের ঘটনায় মাত্র ৩ থেকে ৬২টি পাখি দেখা গিয়েছিল। সংখ্যার এই উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি বর্তমান পরিস্থিতির তীব্রতাকেই তুলে ধরছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরিবেশবাদী সংগঠন অডুবন সোসাইটির পরিচালক রোসাবেল মিরো জানান, জুন মাস থেকেই এসব অতিথি পাখির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট করেন, এগুলো কোনো পরিযায়ী প্রজাতি নয়; বরং খাদ্যের ঘাটতির কারণেই তারা এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে বাধ্য হচ্ছে। তার ভাষায়, এই পাখিদের পানামায় আগমন তখনই ইঙ্গিত দিচ্ছিল যে প্রশান্ত মহাসাগরে এবার অত্যন্ত শক্তিশালী একটি এল নিনো গড়ে উঠছে। তিনি আরও যোগ করেন, এই প্রভাব কেবল স্থান বদলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

অতীতের এল নিনোগুলোর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করে মিরো ব্যাখ্যা করেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে সামুদ্রিক পাখিদের প্রজননচক্রে বিঘ্ন ঘটে। পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাবে তাদের বংশবৃদ্ধির সফলতার হারও কমে যায়। এবার যেহেতু এল নিনোর শক্তি তুলনামূলকভাবে বেশি, তাই পাখিদের প্রজননে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও গভীর হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।