নিউজিল্যান্ডের উত্তরাঞ্চলের পুরেরুয়া উপদ্বীপে দীর্ঘ তিন বছর ধরে সংরক্ষণকর্মীদের সঙ্গে টানাটানির লড়াই চালিয়ে যাওয়া এক বুনো বিড়াল অবশেষে ধরা পড়েছে। ‘নাইন লাইভস’ নামে পরিচিত এই বিড়ালটিকে ঘিরে ছিল নানা কৌতূহল ও উদ্বেগ। স্থানীয়দের ধারণা, প্রায় তিন-চতুর্থাংশ পাতেকে হাঁস এই বিড়ালের শিকারেই প্রাণ হারিয়েছিল। শুধু তাই নয়, কিউই পাখির ছানাও বাদ যায়নি এর তালিকা থেকে।

২০২৩ সালে এই উপদ্বীপে ছাড়া হয়েছিল বিরল প্রজাতির পাতেকে হাঁস। তখন মাত্র ২১টি পাখি ছাড়া হয়েছিল, যা ছিল গোটা প্রজাতির প্রায় এক শতাংশ। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই ওই পাখিগুলো একে একে রহস্যজনকভাবে হারিয়ে যেতে শুরু করে। বনজুড়ে ক্যামেরা বসিয়ে দেখা যায়, নিয়মিত শিকার করছে একটি ধূসর রঙের বড়সড় বিড়াল। প্রকল্প সমন্বয়কারী অ্যান্ড্রু মেন্টর জানান, এই বিড়ালটিই বেশিরভাগ পাতেকের মৃত্যুর কারণ।

বিড়ালটি এত দিন ধরে ধরাপাশে এড়িয়ে যাওয়ার কারণ ছিল তার অদ্ভুত স্বভাব। নিউজিল্যান্ডের অধিকাংশ বুনো বিড়াল উত্তর আফ্রিকার শিকারি বিড়ালের বংশধর, ফলে শিকার তাদের রক্তে। নাইন লাইভস কখনো একই জায়গায় দুবার ফাঁদের কাছে আসত না। আবহাওয়া, চাঁদের আলো বা পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের চলার পথ বদলে নিত। মেন্টর বলেন, রাতের পর রাত ঠান্ডা জঙ্গলে নিঃশব্দে অপেক্ষা করেও কোনো লাভ হয়নি বহুবার। মনে হচ্ছিল, কোথায় ক্যামেরা বসানো হচ্ছে তা যেন জানে ওই বিড়ালটি।

এই অসাধারণ লুকোচুরির কাহিনি এতটাই আলোচিত হয়েছিল যে সিএনএনের একটি দল এ বছরের শুরুতে নিউজিল্যান্ডে গিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। রেডিও পডকাস্টেও স্থান পেয়েছিল নাইন লাইভসের গল্প। এত আয়োজন দেখে অবাক লাগলেও প্রকৃতিতে একটি মাত্র শিকারি প্রাণীও কীভাবে পুরো বাস্তুতন্ত্র বিপর্যস্ত করে দিতে পারে, তা এই ঘটনা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বিশেষত দ্বীপের মতো বিচ্ছিন্ন ও ভঙ্গুর বাস্তুতন্ত্রে এই হুমকি আরও তীব্র।

অবশেষে গত বৃহস্পতিবার রাতে ফাঁদে পা দেয় বিড়ালটি। টানা তৃতীয় রাত একই জায়গায় আসায় সংরক্ষণকর্মীরা এই সুযোগ কাজে লাগান। এই সময়ে তারা ফাঁদের ধরন, টোপ, এমনকি ক্যামেরার নেটওয়ার্কও বারবার বদলেছিলেন। ধীরে ধীরে পুরো এলাকা নজরদারির আওতায় আনা হয়।

বিড়ালটিকে হত্যা করা নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন উঠতে পারে। মেন্টর স্বীকার করেন, এটি মোটেও সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। তবে তিনি স্পষ্ট করেন, পোষা বিড়াল আর বুনো বিড়াল এক জিনিস নয়। ঘরের বিড়াল মানুষের সঙ্গী ও ভালোবাসার প্রাণী। কিন্তু জঙ্গলে হারিয়ে গিয়ে বুনো হয়ে ওঠা বিড়াল স্থানীয় বন্যপ্রাণীর জন্য সরাসরি হুমকি। নিউজিল্যান্ডের বনে হাজার হাজার এমন বুনো বিড়াল ঘুরে বেড়ায়, প্রতিটি পাতেকে বা কিউইর মতো অরক্ষিত প্রাণীর জন্য বিপদ ডেকে আনতে পারে।

এই ঘটনা সংরক্ষণকর্মীদের নতুন শিক্ষাও দিয়েছে। ২০২৩ সালে পাতেকে ছাড়ার সময় তারা মনে করেছিলেন এলাকাটি যথেষ্ট নিরাপদ। পোসাম নির্মূলের পাশাপাশি ইঁদুর ও স্টোটের সংখ্যাও অনেক কমে এসেছিল। কিন্তু একটি চতুর বিড়ালই গোটা প্রকল্প ভেস্তে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল। তাই নতুন করে পাতেকে ছাড়া আপাতত বন্ধ রাখা হয়েছে, যতক্ষণ না এলাকাটি পুরোপুরি নিরাপদ প্রমাণিত হয়।

তবে আশার খবরও আছে। পুরেরুয়া উপদ্বীপে বর্তমানে কিউই পাখির সংখ্যা প্রায় তিন হাজার, যা সম্ভবত গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে ঘন বসতি। ছোট্ট নীল পেঙ্গুইন কোরোরা, সামুদ্রিক পাখি, নানা জাতের গিরগিটি ও জলাভূমির পাখিও টিকে আছে বছরের পর বছর ধরে চলা নীরব পরিশ্রমের কারণে। সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে মেন্টর সবাইকে নিয়ে একবেলা খাওয়াদাওয়ার আয়োজনের কথাও জানিয়েছেন।

নাইন লাইভসের গল্পটি আসলে একটি বিড়ালের গল্প নয়; এটি প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জের প্রতিচ্ছবি। মানুষ যখন নিজের পোষা প্রাণী বনে ছেড়ে দেয় বা হারিয়ে ফেলে, তার প্রভাব পড়ে এমন সব প্রাণীর ওপর যাদের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্কই নেই। একটি উড়তে না পারা ছোট্ট হাঁস বা লাজুক কিউই ছানার বেঁচে থাকা নির্ভর করে মানুষের দূরবর্তী সিদ্ধান্তের ওপর।

তিন বছরের অপেক্ষা শেষ হলেও পুরেরুয়ার জঙ্গলে কাজ শেষ হয়নি। নতুন কোনো বিড়াল বা হুমকি আবারও আসতে পারে সেই দুই কিলোমিটার চওড়া স্থলভাগ পেরিয়ে, যা উপদ্বীপকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করেছে। সংরক্ষণকর্মীরা তাই আবার নজরদারি, খোঁজা ও সাড়া দেওয়ার পুরোনো কাজে ফিরে গেছেন।