ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সামনের ছোট বাগানটি নানা বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদে সমৃদ্ধ। সম্প্রতি সেখানে চোখে পড়েছে সাদা-গোলাপি রঙের এক অনন্য ফুল, যা নিচের দিকে ঝুলে থাকা ঘণ্টার আদলে সাজানো। স্থানীয়ভাবে এই ফুল রাজঘণ্টা বা রাজধুতুরা নামে পরিচিত। এই কলেজের সাবেক কর্মস্থল হিসেবে পরিচিত অধ্যাপক চয়ন বিকাশ ভদ্র গত ১ জুন সেখানে গিয়ে এই ফুলের ছবি তোলেন। তিনি জানান, ময়মনসিংহের সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ (মহিলা) ক্যাম্পাসেও এই ফুল দেখা গেছে।

রাজঘণ্টা ফুলের বৈজ্ঞানিক নাম Brugmansia suaveolens। এটি Solanaceae পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। বিশ্বজুড়ে এটি অ্যাঞ্জেলস ট্রাম্পেট নামে বেশি পরিচিত। এর ফুলগুলো দেখতে অনেকটা রাজকীয় ঘণ্টার মতো ঝুলে থাকে, যার কারণে বাংলায় এর নামকরণ হয়েছে রাজঘণ্টা। এই উদ্ভিদের আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার ক্রান্তীয় অঞ্চল, বিশেষ করে ব্রাজিল। তবে তার চমৎকার রূপ ও মিষ্টি সুবাসের কারণে বর্তমানে বাংলাদেশ ও ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বাগান ও পার্কে এটি শোভাবর্ধনকারী উদ্ভিদ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। এটি আর্দ্র জলবায়ু ও সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটিতে ভালো জন্মে।

একটি বহুবর্ষজীবী গুল্ম বা ছোট বৃক্ষ হিসেবে রাজঘণ্টা সাধারণত ৩ থেকে ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর পাতা বড়, ডিম্বাকার এবং কিছুটা খসখসে প্রকৃতির। তবে এই উদ্ভিদের আসল আকর্ষণ হলো এর ফুল। ফুলগুলো সাধারণত সাদা, হালকা হলুদ বা গোলাপি রঙের হয় এবং একেকটি ফুল ২০ থেকে ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। ফুলগুলো ডালে সোজা না হয়ে নিচের দিকে মুখ করে ঝুলে থাকে, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় গাছজুড়ে অসংখ্য ঘণ্টা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে।

রাজঘণ্টার আরেকটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলো এর তীব্র ও মিষ্টি সুবাস। দিনের বেলা এই ফুলে তেমন কোনো গন্ধ পাওয়া যায় না। কিন্তু সূর্য ডোবার পর সন্ধ্যা থেকে এর সুবাস চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। রাতের নিশাচর পতঙ্গ, বিশেষ করে মথদের পরাগায়নের জন্য আকৃষ্ট করতেই রাজঘণ্টা রাতে তার সুবাস ছড়ায়। এই চমৎকার সুগন্ধের কারণে রাতে বাগানে এটি এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে।

ঐতিহ্যগতভাবে কিছু উপজাতীয় সংস্কৃতিতে রাজঘণ্টার পাতা ও ফুল ব্যথানাশক ও হাঁপানির উপশমকারী হিসেবে ব্যবহৃত হতো, তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানে এর ব্যবহার অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত। কারণ সৌন্দর্য ও সুবাসের জন্য জনপ্রিয় হলেও রাজঘণ্টা অত্যন্ত বিষাক্ত একটি উদ্ভিদ। এই গাছের পাতা, ফুল, ফল ও বীজ—সব অংশেই স্কোপোলামিন ও অ্যাট্রোপিন নামক ক্ষতিকারক অ্যালকালয়েড থাকে। ভুলবশত এর কোনো অংশ শরীরে প্রবেশ করলে তীব্র বিভ্রম, পক্ষাঘাত, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে। তাই বাড়িতে এই গাছ থাকলে শিশু ও পোষা প্রাণীদের এর থেকে দূরে রাখা জরুরি।

বিষাক্ত হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে রাজঘণ্টা বাগানের সৌন্দর্য বদলে দিতে পারে। এই গাছের প্রচুর সূর্যালোক ও নিয়মিত পানির প্রয়োজন। বর্ষাকালের শেষে গাছ ছাঁটাই করলে এর আকৃতি সুন্দর থাকে এবং পরবর্তী মৌসুমে প্রচুর ফুল ফোটে। ডাল কেটে সহজেই এর বংশবৃদ্ধি করা যায়। অধ্যাপক চয়ন বিকাশ ভদ্রের মতে, রাজঘণ্টা বা রাজধুতুরা প্রকৃতির এমন এক সৃষ্টি, যা একই সঙ্গে মোহনীয় ও বিপজ্জনক। সঠিক সতর্কতা অবলম্বন করে বাগানের এক কোণে এই গাছ লাগালে তা বাগানকে অনন্য এক নান্দনিক মাত্রা দিতে পারে।