বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনায় প্রাণীর সংখ্যা জানার গুরুত্ব অপরিসীম। বিশেষ করে সুন্দরবনের মতো বিশাল ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বাঘের অস্তিত্ব সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি। বাঘ এই বনের সবচেয়ে বড় প্রাণী, এবং এর সংখ্যা জানা থাকলে বিজ্ঞানসম্মত সংরক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে, বাঘের শিকার প্রাণী যেমন হরিণ, শূকর, শজারু ইত্যাদির প্রাপ্যতাও বাঘের টিকে থাকার জন্য অত্যাবশ্যক।

বর্তমানে বিশ্বের ১৩টি বাঘসমৃদ্ধ দেশের মধ্যে লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে বাঘ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সময়মতো সঠিক তথ্যের অভাবে সংরক্ষণ ব্যবস্থা নিতে দেরি হওয়ায় এমন ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশের সুন্দরবনেই কেবল এখন বাঘ টিকে আছে; অন্যান্য বনাঞ্চলে শিকার প্রাণীর অভাবে বাঘ স্থানীয়ভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, ঘূর্ণিঝড়, চোরা শিকার ও বাঘ-মানুষ দ্বন্দ্বের কারণে সুন্দরবন থেকে বাঘ বিলুপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকায় প্রতি তিন বছর পরপর বাঘের অবস্থা পর্যবেক্ষণ জরুরি।

বাঘ প্রধানত একাকী একটি নির্দিষ্ট সীমানায় বিচরণ করে, যাকে তার রাজ্য বলা হয়। সুন্দরবনে প্রতিটি বাঘের রাজ্যের আকার সাধারণত ২০ থেকে ৩০ বর্গকিলোমিটার। রাজ্য পাহারা দিতে গিয়ে বাঘ নিয়মিত খাল পাড়ি দেয়, ফলে নরম কাদায় তার পায়ের ছাপ পড়ে। এই পায়ের ছাপ বা ট্র্যাক সেট জরিপ করে বাঘের আপেক্ষিক অবস্থা বোঝা যায়। উনিশ শতকের শুরুর দিকে স্থানীয় মানুষের সাথে কথা বলেই বাঘের অবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করা হতো। পরবর্তীতে বন কর্মকর্তা সরোজ চৌধুরী খালের পাড়ের পায়ের চিহ্ন পরিমাপ করে বাঘের সংখ্যা বের করার পদ্ধতি প্রচলন করেন। ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে সুন্দরবনে পায়ের ছাপ জরিপ করে বাঘ গণনা করে।

পায়ের ছাপ জরিপের জন্য বাঘের পায়ের ছাপের ওপর প্লাস্টার অব প্যারিস ঢেলে একটি আয়তাকার প্লেট তৈরি করা হতো। তবে এই পদ্ধতি পুরোপুরি নির্ভুল নয়, কারণ কাদা ও শক্ত মাটিতে একই বাঘের পায়ের ছাপের আকার ভিন্ন হতে পারে, ফলে সংখ্যা অতিরঞ্জিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই বাঘ বিশেষজ্ঞরা এই পদ্ধতি অগ্রহণযোগ্য বলে বিবেচনা করেন।

বর্তমানে সবচেয়ে বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতি হিসেবে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতি ব্যবহৃত হচ্ছে। মানুষের আঙুলের ছাপের মতোই বাঘের শরীরের ডোরাকাটা দাগ অনন্য। এই বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে বাঘ শনাক্ত করা হয়। সুন্দরবনে ২০১৫, ২০১৮ ও ২০২৩ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিং পদ্ধতিতে বাঘ জরিপ সম্পন্ন হয়েছে। এই পদ্ধতিতে বাঘের চলাচলের পথে ২০ থেকে ৩০ ফুট দূরত্বে দুটি গাছে ক্যামেরা বসানো হয়, যা ৪৫ দিন ধরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ছবি তোলে। পরে সব ক্যামেরার ছবি বিশ্লেষণ করে ডোরার প্যাটার্ন মিলিয়ে একক বাঘ শনাক্ত করা হয়।

ক্যামেরা ট্র্যাপিং থেকে প্রাপ্ত তথ্যের মাধ্যমে সুন্দরবনের অভয়ারণ্যের অভ্যন্তর ও বাইরে বাঘের অবস্থান, লিঙ্গ অনুপাত, বাচ্চা লালন-পালনের এলাকা এবং আগের জরিপের ফলাফলের সঙ্গে তুলনা করে সংরক্ষণ কৌশল নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।