বাংলাদেশের বাঘ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়ে বিশিষ্ট প্রাণিবিদ অধ্যাপক মো. আনোয়ারুল ইসলাম বলেছেন, প্রকৃত সুরক্ষা তখনই সম্ভব হবে যখন সাধারণ মানুষকে এ কাজে যুক্ত করা যাবে। সম্প্রতি দেশে বন্যপ্রাণী আইন ও নীতিমালা জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ২০২৬ সালে সর্বশেষ সংশোধন ও এ মাসেই গঠিত ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন। তবে তিনি মনে করেন, আইন ও কমিশন যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন জনগণের মধ্যে সচেতনতা ও অংশগ্রহণ।

অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলাম তার এক স্মৃতিচারণে জানান, অতীতে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাঘের বিচরণ ছিল। ব্রিটিশ আমলের পুলিশ রেকর্ড বলছে, ১৮৩৭ সাল পর্যন্ত ঢাকায় প্রতি বছর অন্তত একজন মানুষ বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারাতেন। তিনি নিজেও ঢাকা-টাঙ্গাইল সড়কে বাঘের সামনাসামনি দেখা পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথা বলেন। পুরানা পল্টনে বসবাসের সময় প্রতিদিন হাঁটতে বের হলে পুরোনো এয়ারপোর্ট এলাকায় ভয় পেতেন, কারণ তার মাত্র পাঁচ-ছয় বছর আগে সেখানে একটি বড় বাঘ নিহত হয়েছিল—যা ছিল একটি প্রকৃত রয়েল বেঙ্গল টাইগার। তিনি জানান, সে সময় বাঘ ও চিতাবাঘ মারার জন্য পুরস্কার দেওয়া হতো। প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস ও নির্বিচার শিকারের কারণে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল থেকে বাঘ ও চিতাবাঘ হারিয়ে গেছে। ১৯০০ সালের দিকেও জমিদার কুমার রমেন্দ্র নারায়ণ রায় চৌধুরী ঢাকার কাছে ভাওয়ালের বনে বাঘ শিকার করেছিলেন। বর্তমানে দেশের একমাত্র বাঘের আশ্রয়স্থল সুন্দরবন।

তিনি আরও বলেন, ১৯৯২ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দেশে ফেরার আগে উপাচার্যের বাসভবনে এক ভদ্রমহিলা তার স্ত্রীকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় ব্যক্তিগত বাড়ি থাকা সম্ভব কি না। এই প্রশ্নের মাধ্যমে ওই বিদেশি নারী বাংলাদেশের দারিদ্র্য ও জনসংখ্যা সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন বলে তিনি মনে করেন। এর আগে ১৯৮১ সালে মিনেসোটা রাজ্যে প্রশিক্ষণে গেলে এক আলাস্কাবাসী তাকে জানিয়েছিলেন, সারাজীবন বাঘ দেখার ইচ্ছা ছিল; বাঘের দেশের মানুষ হিসেবে তাকে দেখেই সে ইচ্ছা পূরণ হয়েছে।

স্বাধীনতার আগে বন্যপ্রাণী রক্ষায় পৃথক আইন ছিল না। ১৯৭৩ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশে এ বিষয়ে প্রথম পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৭৪, ২০১২ ও ২০২৬ সালে আইন সংশোধন ও কার্যকর করার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে প্রণীত হয় জীববৈচিত্র্য আইন। সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে রাষ্ট্রকে বন ও বন্যপ্রাণীর সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চলতি মাসেই সরকার ওয়াইল্ডলাইফ কমিশন গঠন করেছে। এসব উদ্যোগ থেকে স্পষ্ট যে, বাঘ ও বন্য প্রাণী সংরক্ষণে রাজনৈতিক সদিচ্ছা বিদ্যমান।

সম্প্রতি বন বিভাগ একটি প্রশংসনীয় কাজ করেছে। গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবন থেকে একটি আহত বাঘিনীকে উদ্ধার করে চিকিৎসা দিয়ে এ মাসের ১২ তারিখে আবার বনে অবমুক্ত করা হয়। এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী ছিলেন অধ্যাপক আনোয়ারুল ইসলামসহ অনেকেই। তিনি বলেন, সেই মুহূর্তে সবার মনে একটাই বাক্য প্রতিধ্বনিত হয়েছে—‘বাঘ আমাদের গর্ব, বাঘ সুরক্ষা করব’।