স্থানীয় বাজারে হঠাৎ একটি অচেনা মাছ ভিড় জমিয়েছিল। অনেকের কাছেই এটি ছোটবেলার দাদার মুখে শোনা বিস্মৃত কোনো গল্পের চরিত্র হয়ে ধরা দিয়েছে। কেউ কেউ ভুল করে সাপ ভেবেছিলেন। এশিয়ার বৃহত্তম হাওর হাকালুকিতেও এমন মাছ আগে খুব একটা জানে না। অথচ একদা সিলেট আর মৌলভীবাজারের হাওর অঞ্চলে এই মাছ ছিল নিত্যদিনের খাবার। বিভিন্ন এলাকায় এর নামও বিভিন্ন— বামুস, বামোস, বামাস, বাউস, বাওস, বানেহারা, বাউ বাইম বা তেলকোমা। তবে বিজ্ঞানসম্মত নাম এটির একটাই: অ্যানগুইলা বেঙ্গালেনসিস বেঙ্গালেনসিস। ইংরেজিতে বলা হয় ইন্ডিয়ান মটলড ইল।
এটি অ্যাঙ্গুইলিডি গোত্রের সদস্য এবং বাইম মাছের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। দেহটিও কাছাকাছি ধরনের লম্বাটে এবং তেলতেলে। আঁশ এতই সুক্ষ্ম যে হাত দিয়ে বুলিয়ে বোঝা দুষ্কর। গায়ের রং জলপাই বা হলদেটে বাদামির ওপর যেন কেউ গাঢ় ছোপ এঁকে দিয়েছে। এই ছোপগুলো বাচ্চা অবস্থায় না দেখা গেলেও পরিণত হলে স্পষ্ট হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক মাছ অনায়াসে এক মিটার পেরিয়ে যায়, কোনো কোনো নথি বলছে এটি ১২০ সেন্টিমিটারেরও বেশি হয়। এর মুখে কোনো স্পর্শী নেই, শ্রোণী পাখনাও অনুপস্থিত। পুরো দেহ বেঁকিয়ে তরঙ্গের মতো করে এটি সাঁতরায়।
কিন্তু আসল চমক লুকিয়ে আছে এর জীবনে। বামুস একটি ক্যাটাড্রোমাস প্রজাতি। অর্থাৎ এর জন্ম সমুদ্রের লোনা জলে, বেড়ে ওঠে মিঠাপানির নদী-নালায়, এবং শেষে ডিমাণ্ড ছাড়তে আবার ফিরে আসে সমুদ্রে। স্যামন মাছের জীবনচক্র এর সম্পূর্ণ বিপরীত। স্যামন মিঠাপানিতে জন্মায়, সমুদ্রে বড় হয়ে ডিমাণ্ড দিতে নদীতে ফিরে আসে। বামুসের গল্প যেন সেই প্রতিবিম্ব। যাত্রা শুরু হয় বঙ্গোপসাগরের কোনো গভীর অঞ্চলে, তবে সঠিক স্থান আজও অজানা। ডিম ফুটে বার হয় লেপ্টোসেফালাস নামক এক স্বচ্ছ লার্ভা, যা দেখতে উইলোপাতার মতো। শরীর ভেদ করে আলো চলে যায়। এই লার্ভা কয়েক সপ্তাহ ধরে সমুদ্রের স্রোতে ভাসতে থাকে। পরে রূপান্তরিত হয়ে গ্লাস ইল হয়। কাঁচের মতো স্বচ্ছ, প্রায় অদৃশ্য এক ক্ষুদ্র পোনা যা নিজেই নদীর মোহনার সন্ধান করে।
মিঠাপানির টানে সেটি প্রবেশ করে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা ও কর্ণফুলীর মতো নদীতে। কখনো কখনো আরও উত্তরে, ময়মনসিংহের কংস বা সোমেশ্বরীর মতো পাহাড়ী ঝর্ণায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়। সেখানে এটি দশ থেকে পনেরো বছর কাটায়। পুকুরের কোনা, নদীর পাথরের গর্তে লুকিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। ছোট মাছ, চিংড়ি, কাঁকড়া, কেঁচো এমনকি জলজ উদ্ভিদও এর খাদ্য। মাঝেমধ্যে মেগালোপা লার্ভা ও পোকামাকড়ও জোটে। তারপর একদিন, কোনো অজানা সংকেতে, দেহে ফিরিয়ে চলার তাড়া জাগে। সমুদ্রের পথে শুরু হয় শেষযাত্রা। সুদূরের কোনো জলে ডিম ছেড়ে দেওয়ার পরই মা ও বাবা মাছ উভয়েই মারা যায়। লাখটির মতো ডিম রেখে যায়, কিন্তু নিজে আর কখনো ফেরে না।
জীবনের একটিমাত্র চক্রে দেহকে বারবার ভাঙতে ও গড়তে হয় একে। লোনাপানি থেকে মিঠাপানি, আবার মিঠাপানি থেকে লোনাপানির প্রতি পর্যায়ে দেহে লবণ-পানির ভারসাম্য পুনরায় স্থাপন করতে হয়। মানুষের দেহ এমন অভিঘাত সইতে পারত না। এক সময় কর্ণফুলী জলাধার থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত, হাওর-বাঁওড়-নদী মিলিয়ে বাংলাদেশে বামুসের বিস্তৃত আবাস ছিল। ভৈরব সেতুর কাছে প্রচুর মাছ ধরা পড়ত বলে কথিত আছে। রপ্তানির বাজারেও জ্যান্ত বড় মাছের চাহিদা ছিল। পুষ্টি সম্পন্ন হওয়ায় সুনাম ছিল। এখন বাজারে প্রায় দেখাই যায় না। কেউ ভাগ্যক্রমে চার-পাঁচ কেজির একটি পেলে চড়া দাম ছাঁকেন এবং সেটি পাড়া-পড়শীর কাছে গল্পের বিষয় হয়। আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় এই মাছকে ‘সংকটন্ন’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ আবাসস্থল ধ্বংস ও অবক্ষয়। নদী দখল, বাঁধ নির্মাণ, দূষণ এবং অতিরিক্ত মাছ ধরা – সব মিলিয়ে মাছটির পথ রুদ্ধ করে দিয়েছে ধীরে ধীরে। একটি বাঁধ শুধু পানি নয়, আটকে ফেলছে একটি পুরো জীবন।




