যুক্তরাষ্ট্রের সাউথ ডাকোটা অঙ্গরাজ্যে ২০১৫ সালের অক্টোবরে একটি প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর আবিষ্কার বিজ্ঞানী মহলে তুমুল আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। ৬৬ মিলিয়ন বছর পুরনো সেই প্রাণীটি ছিল তীক্ষ্ণ দাঁতবিশিষ্ট এক শিকারি, যার সমগ্র দেহ পালকে আচ্ছাদিত ছিল এবং দ্বিপদে বিচরণ করত। পাঁচ মিটার দৈর্ঘ্যের ও মানুষের চেয়ে সামান্য উঁচু এই জীবটি অত্যন্ত দ্রুতগতি ও চটপটে ছিল। 'ডাকোটার্যাপটর' নামধারী এই ডাইনোসরটির পেছনের পায়ের দ্বিতীয় আঙুলে বিশাল বাঁকানো নখর ছিল, যা ভেলোসির্যাপটর প্রজাতির অনুরূপ। এই ধরনের পূর্ণাঙ্গ ও রঞ্জিত চিত্র পুনর্নিমাণ এখন যেন অতি সহজবোধ্য মনে হয়। অথচ কোটি বছর আগে বিলুপ্ত একটি প্রজাতির প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের পদ্ধতিটি মোটেও সরল নয়।
যুগের পর যুগ ধরে ভূগর্ভে প্রাপ্ত দানবীয় কঙ্কাল মানবমস্তিষ্কে বিচিত্র সব কল্পনার জন্ম দিয়েছে। প্রাচীন চীনের ড্রাগনের পৌরাণিক কাহিনি অথবা গ্রিক পুরাণের গ্রিফিন নামক অর্ধ-সিংহ, অর্ধ-ঈগল প্রাণীর ধারণা—এসবের পেছনে প্রোটোসেরাটপসের মতো ঠোঁটযুক্ত প্রজাতির জীবাশ্মও দায়ী থাকতে পারে। ১৭৬৩ সালে রিচার্ড ব্রুকস একটি পায়ের ভগ্ন হাড় পেয়ে সেটিকে ধর্মীয় পুস্তকের দৈত্যের অংশ ভেবেছিলেন, যা প্রকৃতপক্ষে ছিল মেগালোসরাসের হাঁড়। দেড় শতাব্দী পর ১৮২৪ সালে বিজ্ঞানী উইলিয়াম বাকল্যান্ড এটিকে বিলুপ্ত সরীসৃপ হিসেবে সঠিকভাবে চিহ্নিত করেন। ডাইনোসর শব্দটির প্রচলনই ঘটে ১৮৪২ সালে।
দীর্ঘকাল এসব প্রাণীকে কুমির সদৃশ ভাবা হলেও, ১৯৬০-এর দশকে জন অস্ট্রমের মতবাদ ছিল ভিন্ন। তিনি যুক্তি দেন যে এরা পাখির মত চটপটে ও উষ্ণ রক্তের ছিল। ১৯৯৬ সালে চীনের লিয়াওনিং অঞ্চলে পালকযুক্ত ডাইনোসরের ফসিল আবিষ্কারের মাধ্যমে তার এই ধারণার সপক্ষে জোরালো প্রমাণ মেলে। সেখানে ৫০-এর অধিক প্রজাতির দেহাবশেষ থেকে তুলতুলে পশম থেকে আরম্ভ করে ওড়ার জন্য গঠিত বড় পালকও পাওয়া গেছে। যেমন, ভেলোসিরাপটর ও ডাকোটার্যাপটরের বাহুর অস্থির পাতার সংযুক্তির চিহ্ন বোঝায় যে তাদের হাতে পুন্নাঙ্গ ডানা ছিল।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা কোনো ডাইনোসরের কাঁকাল অ্যানালাইসিস করার সময় সেটিকে বর্তমান প্রাণীদের, বিশেষ করে পাখি ও কুমিরের, দেহের গঠনের সাথে মিলিয়ে সাজান। কোনো অস্থি অনুপস্থিত থাকলে সমগোত্রীয় অন্যান্য প্রজাতির হাড়ের সাথে সঙ্গতি রেখে সেই ফাঁক পূরণ করা হয়। হাড় ও দাঁতের অত্যন্ত সূক্ষ্ম গঠন বিশ্লেষণ করে বোঝা যায় প্রাণীটির চলন-ভঙ্গি বা শিকার কৌশল। শুধু কঙ্কাল সাজালেই সম্পূর্ণ চেহারা মূর্ত হয় না; এর জন্য পেশী, মেদ এবং ত্বকের স্তর সম্পর্কে ধারণা প্রয়োজন।
বিলুপ্ত সরীসৃপদের হাড়ের গায়ে যে নির্দিষ্ট দাগচিহ্ন থাকে, সেখান থেকে আন্দাজ করা যায় ওই স্থানে যুক্ত পেশীটি কতটা শক্তিশালী ও বৃহৎ ছিল। দীর্ঘ গ্রীবা বিশাল ডিপ্লোডোকাসের মেরুদণ্ডের পেশীগুলি দেহকে প্রসারিত করতে সহায়তা করত। আধুনিক ত্রিমাত্রিক মডেলিংয়ের সাহায্যে এই দানবীয় প্রাণীগুলোর হাঁটার ঢং বা চিবোনোর প্রক্রিয়া বোঝা সম্ভব হয়। এডমন্টোসরাসের মতো তৃণভোজীর ফসিলে কুমির-সদৃশ আঁশযুক্ত ত্বকের ছাপ পাওয়া গেলেও, অ্যাঙ্কাইলোসরদের গায়ে ছিল শক্ত অস্থিনির্মিত বর্ম ও কাঁটা। কিছু কিছু প্রজাতির গাল ছিল, যা চিবোনোর সময় খাদ্য পড়া আটকাত, আর ট্রাইসেরাটসের মুখে ছিল পাখির ঠোঁটের মত শক্ত কাঠামো।
তৃণভোজীদের গায়ে আঁশ থাকলেও, বেশির ভাগ মাংসাশী ডাইনোসরের সম্পূর্ণ শরীর ঢাকা থাকত নরম পালকে। বর্তমান অগ্রগতি এসব পালক ও ত্বকের প্রকৃত রঙ উন্মোচন করার পথেও নিয়েছে। ইলেকট্রন মাইক্রোস্কোপির সাহায্যে ফসিলের অভ্যন্তরস্থ রঞ্জক কণিকা পরীক্ষা করে ইতিমধ্যে জানা গেছে যে কিছু প্রাগৈতিহাসিক সামুদ্রিক প্রাণীর পৃষ্ঠদেশ ছিল কালো এবং উদর ছিল সাদা বা ফ্যাকাশে। বহু বছর ব্যাপী অনুসন্ধিৎসু অধ্যবসায় ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে প্লিয়োবিজ্ঞানীরা আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি নিখুঁতভাবে ডাইনোসরের প্রকৃত রূপ নির্ণয় করতে সক্ষম হচ্ছেন।




