৫০ বছরের এক দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে লর্ডসের মাঠে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে ভারতের নারী ক্রিকেট দল। হার্মানপ্রীত কৌরের নেতৃত্বে দলটি ইংল্যান্ডকে ২৭০ রানের বিশাল ব্যবধানে পরাজিত করে লন্ডনের এই আইকনিক ভেন্যুতে প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়। এই ম্যাচটি ছিল লর্ডসে অনুষ্ঠিত প্রথম নারী টেস্ট, পুরুষদের প্রথম টেস্টের ১৪২ বছর পর এটি আয়োজিত হলো।

ম্যাচের চতুর্থ ও শেষ দিনে ইংল্যান্ডের দ্বিতীয় ইনিংস মাত্র ১৮৬ রানে শেষ করে ভারতের বোলাররা। স্নেহ রানা সোফি একলস্টোনকে বোল্ড করে জয় নিশ্চিত করেন। তার আগে প্রথম ইনিংসে ২২ বছর বয়সী ক্রান্তি গৌড় ৩৭ রানে ৫ উইকেট নিয়ে লর্ডসের অনার বোর্ডে বোলিং বিভাগে নাম লেখান, যা কোনো নারীর জন্য প্রথম। মধ্যপ্রদেশের ছোট শহর হুওয়ারার মেয়ে ক্রান্তির মা তার প্রথম ক্রিকেট কিট কেনার জন্য নিজের গয়না বন্ধক রেখেছিলেন।

রোববার বাঁহাতি ব্যাটসম্যান যাস্তিকা ভাটিয়া ১১৩ রানের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরি করে লর্ডসের ব্যাটিং বোর্ডে স্থান করে নেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "পথিকৃৎদের অবদান অমূল্য। তারাই ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছেন বলেই আমরা আজ এই অবস্থানে আসতে পেরেছি। তাদের স্বীকৃতি পাওয়া উচিত, যা এখনও তারা পাননি।"

ভারতীয় নারী ক্রিকেটের গোড়াপত্তন ১৯৭৩ সালে, মহেন্দ্র কুমার শর্মা উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অফ ইন্ডিয়া প্রতিষ্ঠা করলে। সীমিত সম্পদ আর অগাধ বিশ্বাস নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকরা প্রথম প্রজন্মের নারী ক্রিকেটার তৈরি করেন। ১৯৭৬ সালে শান্তা রঙ্গস্বামীর নেতৃত্বে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক সিরিজ খেলে ভারত। এর এক দশক পর ১৯৮৬ সালে শুভাঙ্গী কুলকার্নি ও ডায়ানা এদুলজির নেতৃত্বে প্রথম ইংল্যান্ড সফর করে তারা। চার দশক পর হার্মানপ্রীতের দল ইংল্যান্ডের মাটিতে ভারতের অপরাজিত রেকর্ড ধরে রাখল—১০ টেস্টে ৩ জয় ও ৭ ড্র।

ম্যাচে উপঅধিনায়ক স্মৃতি মান্ধানা ১৫৩ রান করে ম্যাচসেরা হন। তিনি উভয় ইনিংসেই ৭০ রানের বেশি করেন, যা সন্ধ্যা আগারওয়ালের পর দ্বিতীয় ভারতীয় নারী হিসেবে। হার্মানপ্রীত কৌর, দীপ্তি শর্মা ও ঋচা ঘোষ অর্ধশতক করেন। সায়ালি সাতঘার দ্রুত বোলিং করেন এবং স্নেহ রানা, দীপ্তি ও অভিষিক্ত নিতি শ্রী চরণির স্পিন আক্রমণ ছিল নিয়ন্ত্রিত। রানার ১০ টেস্ট ইনিংসে চার বা তার বেশি উইকেটের এই চতুর্থ ঘটনা, যা নীতু ডেভিডের সমান এবং কুলকার্নি ও ঝুলন গোস্বামীর পরেই তার অবস্থান।

দর্শক উপস্থিতির দিক থেকে এ ম্যাচ ছিল রেকর্ডব্রেকিং। চার দিনে মোট ৩৭,৮৪৬ জন দর্শক উপস্থিত হন, যা কোনো নারী টেস্টের জন্য সর্বোচ্চ। শেষ দিনে দেখা যায় সচিন তেন্ডুলকারকে, যিনি ঠিক ২৪ বছর আগে সৌরভ গাঙ্গুলির অধিনায়কত্বে একই মাঠে ন্যাটওয়েস্ট ফাইনাল জিতেছিলেন। আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ ও বিসিসিআইয়ের কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

এই জয় আসে গত বছর নবি মুম্বাইয়ে প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ জয়ের আট মাস পর। তার আগে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিয়েছিল ভারত। হার্মানপ্রীত এখন ভারতের সবচেয়ে সফল টেস্ট অধিনায়ক, তার চার জয়ের বিপরীতে মিতালি রাজের তিন জয়। নিজের ১৭ বছরের ক্যারিয়ারে তিনি মাত্র অষ্টম টেস্ট খেললেন—যা তার প্রজন্মের সুযোগের সীমাবদ্ধতা তুলে ধরে।

ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, "হয়তো দেরি হয়েছে, তবে শেষ হয়ে যায়নি। আমি এখনও খেলছি এবং এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের অংশ হতে পেরেছি।" তাঁর সেই কথাই যেন সত্যি হলো মাঠের উল্লাসে। ভারতের কোনো পথিকৃৎ লর্ডসে উপস্থিত না থাকলেও, যাস্তিকা ও ক্রান্তির ব্যাটে-বলে তাদের আত্মা জেগে উঠেছিল।