বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনালে আজ রাতে মুখোমুখি হচ্ছে ফ্রান্স ও স্পেন। আপাতদৃষ্টিতে এটি কিলিয়ান এমবাপ্পে ও লামিনে ইয়ামালের মতো তারকাদের লড়াই মনে হলেও, মূলত এটি দুই কোচের ভিন্ন ফুটবল দর্শনের লড়াই। ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম এবং স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে — দুজনেই আধুনিক ফুটবলের কৌশলবিদ যাদের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

দেশম ফুটবলকে কবিতা নয়, বরং দাবা হিসেবে দেখেন। তার কাছে চেকমেটই চূড়ান্ত লক্ষ্য। সাবেক সতীর্থ এরিক ক্যান্টোনা একবার তাকে ‘জলবাহক’ বলে উপহাস করেছিলেন, কারণ তিনি মাঠে কঠোর পরিশ্রম করে অন্যদের জন্য বল সরবরাহ করতেন। কিন্তু সেই জলবাহকই এখন খেলোয়াড় ও কোচ উভয় হিসেবে বিশ্বকাপ জেতার বিরল কৃতিত্বের অধিকারী। ব্রাজিলের মারিও জাগালো ও জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারের পর দেশমই তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে এই কীর্তি অর্জন করেছেন। তিনি চাইলে এই বিশ্বকাপ জিতে অধিনায়ক হিসেবে একবার ও কোচ হিসেবে দুইবার বিশ্বকাপ জেতার অনন্য নজির গড়তে পারেন।

অন্যদিকে, দে লা ফুয়েন্তের খেলোয়াড়ি জীবন তেমন উজ্জ্বল ছিল না। বিলবাওতে লেফটব্যাক হিসেবে সুনাম থাকলেও স্পেন দলে ডাক পাননি। তবে কোচ হয়ে তিনি সেই অভাব পূরণ করেছেন। স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দলকে ইউরো জেতানোর পর সিনিয়র দলকেও ইউরো ও নেশনস লিগ জিতিয়েছেন। তার ফুটবল দর্শন স্প্যানিশ ঐতিহ্যের ধীরগতির ‘তিকিতাকা’ থেকে বেরিয়ে এসে আরও গতিশীল পজেশনাল ফুটবলের উপরে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

দেশম তার দলকে নীরব কঠোরতায় আগলে রাখেন। মিডিয়া ও বাইরের রাজনীতি থেকে খেলোয়াড়দের দূরে রাখেন। ব্যক্তিগত জীবনে মায়ের মৃত্যুর পর তিনি কিছুদিন দল ছেড়েছিলেন, কিন্তু ফিরে এসে দেখেন দল আরও বেশি সংহত হয়েছে। সুইডেনের বিপক্ষে ম্যাচে গোল করার পর এমবাপ্পে দৌড়ে গিয়ে দেশমকে জড়িয়ে ধরেন এবং বলেন, বিশ্বকাপের চেয়েও বড় কিছু আছে জীবনে এবং তারা কোচের পাশে রয়েছেন। এই ঘটনা তাদের পেশাদার ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের গভীরতা প্রকাশ করে।

দে লা ফুয়েন্তের কোচিং শৈলী ভিন্ন। তিনি খেলোয়াড়দের চাপমুক্ত রাখতে পছন্দ করেন, ডাগআউটে বেশি চিৎকার করেন না। তার অধীনে খেলোয়াড়রা ট্যাকটিক্যাল ক্লাসের চেয়ে কার্ড বা সাইক্লিং করে সময় কাটান। পেদ্রি, রদ্রি, উনাই সিমোন — এরা সবাই অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২১ দল থেকে তার কাছে পরিচিত। ফলে তিনি তাদের সন্তানের মতো দেখেন। এই সম্পর্কের প্রতিদানও পেয়েছেন তিনি — সব বয়সভিত্তিক পর্যায়ে শিরোপা জিতেছেন, অলিম্পিকে রুপা এনেছেন, এখন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালেও পৌঁছেছেন।

ফ্রান্সের জন্য চিন্তার বিষয় হলো, দেশমের অধীনে ফ্রান্স দে লা ফুয়েন্তের স্পেনের কাছে বারবার হেরেছে — অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১, ইউরো ও নেশনস লিগে। আজ রাতে কি দেশম সেই হিসাব পাল্টে দিতে পারবেন? সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।