২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারান। সে সময় প্রাথমিক চিকিৎসার অভাবে অনেককে মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক ও রাজনৈতিক কর্মী তাসনিম জারা। তিনি যুক্তরাজ্যে অবস্থান করলেও দেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় স্বজনদের খোঁজ নেওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। একপর্যায়ে তিনি ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নালের একটি গবেষণাপত্রের সন্ধান পান, যেখানে সন্ত্রাসী হামলার সময় উন্নত ফার্স্ট এইড কৌশল নিয়ে আলোচনা ছিল। সেই গবেষণার ভিত্তিতে তিনি বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতি তৈরি করেন। শিশুদের ডায়াপার, স্যানিটারি প্যাড ও ট্যাম্পন দিয়ে কীভাবে রক্তপাত বন্ধ করা যায়, সে সম্পর্কে ধারণা দেন। এসব ভিডিও এক কোটির বেশি মানুষ দেখেছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। অনেকে জানিয়েছেন, আন্দোলনে যাওয়ার আগে সেই ভিডিও দেখে ব্যাগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হয়েছিলেন। কারও কারও মতে, সেই পরামর্শ কাজে লাগিয়ে বন্ধুর জীবন বাঁচানো সম্ভব হয়েছে। তবে যারা শেষ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের কথা তিনি ভুলতে পারেন না বলে মন্তব্য করেন তাসনিম জারা।
এ অভ্যুত্থানে শহীদ হওয়া আদিলের গল্প বর্ণনা করেন তিনি। আদিল ক্লাস টেনের ছাত্র। ১৯ জুলাই উত্তরা পূর্ব থানার সামনে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। তার আগের দিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, কে মারা গেছে তা কীভাবে চেনা যায়। মা আইডি কার্ডের কথা বললে পরদিন সকালে সে আইডি কার্ড চেয়ে নেয়। কিন্তু মা ভয়ে কার্ড লুকিয়ে ফেলেন। ফলে লাশ শনাক্ত করতে দেরি হয়। আদিলের হাতের কবজিতে একটি ছোট জাতীয় পতাকা বাঁধা ছিল। মা এখনো আক্ষেপ করেন, আইডি কার্ড দিলে হয়তো ছেলেকে আগে হাসপাতালে নেওয়া যেত এবং বাঁচানো সম্ভব হতো।
ঠাকুরগাঁওয়ে ১৫ বছর বয়সী লামিমের সঙ্গেও দেখা হয় তাসনিম জারার। মা-বাবা নিষেধ করলেও ৪ আগস্ট ফুটবল খেলার কথা বলে আন্দোলনে যোগ দেয় সে। বাঁ চোখে গুলি লেগে তার দৃষ্টি হারায়। এখন তার একমাত্র চাওয়া, দেশ যাতে সুন্দর হয় এবং কোনো চুরি-বাটপাড়ি না থাকে।
আদিলের বাবার কাছে নতুন বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানতে চান তাসনিম জারা। সন্তানহারা পিতা নিজের জন্য কিছু চাননি। তিনি তিনটি দাবি জানিয়েছেন। প্রথমত, শহীদদের কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি হিসেবে না দেখে গোটা দেশের সম্পদ হিসেবে গণ্য করা। দ্বিতীয়ত, সম্পূর্ণ স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, যাতে সাধারণ মানুষ সহজে ন্যায়বিচার পায়। তৃতীয়ত, একটি স্বাধীন নির্বাচন কমিশন গঠন করে সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করা। তার মতে, নির্বাচনব্যবস্থা ঠিক না থাকার কারণেই দেশকে এ মূল্য দিতে হয়েছে।
তাসনিম জারা নিজে রাজনীতি করেন। তিনি শহীদ ও আহতদের প্রত্যাশাগুলো নিজের টেবিলে রেখেছেন। তাঁর মতে, শহীদদের নাম মুখে নেওয়া সহজ, কিন্তু তাদের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করা কঠিন। সেই কঠিন পথেই হাঁটতে হবে নতুন বাংলাদেশকে। প্রশ্ন হলো, শহীদ ও আহতদের সাহসের মতোই সাহসী একটি দেশ গড়তে পারব কি না।




