মৌলভীবাজার সদর উপজেলার কামালপুর ইউনিয়নে অবস্থিত 'থানার বাজার' নামটি শুনেই বোঝা যায়, এর ইতিহাস পুলিশ ফাঁড়ির সঙ্গে জড়িত। ব্রিটিশ আমলে এই এলাকায় একটি পুলিশ গারদ স্থাপিত হয়েছিল, যা স্থানীয়দের কাছে 'থানা' নামে পরিচিতি পায়। সেই থানার পাশেই গড়ে ওঠে এই বাজার। পরবর্তীকালে ব্রিটিশ আমলেই গারদটি স্থানান্তরিত হলেও বাজারের নাম থেকে 'থানা' পরিচিতি মুছে যায়নি। বর্তমানে এটি প্রায় ১৫০ বছরের বেশি সময় ধরে 'থানার বাজার' নামেই পরিচিত।

সপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার ছাড়া বাকি পাঁচ দিন এখানে হাট বসে। সম্প্রতি এক শুক্রবার বিকেলে হাটটি পরিদর্শনে দেখা যায়, রাস্তার অবস্থা বেশ জীর্ণ। কয়েকটি গর্তে পানি জমে থাকায় চলাচলে কিছুটা অসুবিধা হয়। তবুও ব্যবসায়ীরা নিজেদের মতো দোকান সাজিয়ে বসেছেন। স্থায়ী দোকানের সংখ্যা প্রায় একশ, আরও অর্ধশতাধিক অস্থায়ী দোকান রয়েছে যেখানে মাছ, সবজি, পান-সুপারি, মসলাসহ নানা পণ্য বিক্রি হয়। ভিড় শুরুতে কম থাকলেও সন্ধ্যার দিকে ক্রেতা-বিক্রেতার সংখ্যা বাড়তে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দা আকাম উদ্দিন আবদালপুর গ্রামের। তিনি একসময়ের ব্যস্ত হাটের কথা স্মরণ করে বলেন, 'একসময় হাটের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে অনেক সময় লেগে যেত। মাইক ছিল না, তাই চোঙা দিয়ে মানুষকে ডাকা হতো। সন্ধ্যার পরও অনেকে বাজারে আসতেন। রাত আট-নয়টা পর্যন্ত মাছ-সবজি নিয়ে মানুষ হাটে উপস্থিত হতেন। কখনো রাত এগারোটা-বারোটা পর্যন্ত হাট চলত। এখন আর সেই অবস্থা নেই। মানুষ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে গেছে। এখন বিভিন্ন জায়গায় বাজার গড়ে উঠেছে।'

প্রায় ৩৮ বছর ধরে বাজারে মসলাপাতির ব্যবসা করছেন বিনয় দেব। তিনি জানান, হাটের প্রকৃত বয়স বলার মতো কেউ নেই। তবে তিনি তাঁর বাবা-মায়ের কাছ থেকে শুনেছেন, এটি ১৫০ বছরের বেশি পুরনো। 'আগে বাজার আরও পূর্বদিকে ছিল, সেখানেও ব্রিটিশ থানা ছিল। হাফ প্যান্ট পরা পুলিশ আসত। ব্রিটিশ আমলেই থানা স্থাপিত হয় এবং ব্রিটিশ আমলেই তা সরিয়ে নেওয়া হয়। সেই থানার কাছেই বাজারের সূচনা, তাই নাম থানার বাজার,' বলেন তিনি।

সবজি বিক্রেতা আবুল কাশেম জানান, তিনি ২২ বছর ধরে এই পেশায় রয়েছেন। তার মতে, বর্তমানে বাজার আগের মতো জমে না। তবু তিনি সবজি ব্যবসার সঙ্গেই আছেন।

হাটটি আশপাশের বুদমতপুর, আব্দা, ভাদগাঁও, নওয়াগাঁও, কনকপুর, একাটুনা, পুদিনাপুর, নড়িয়া ও হবিগঞ্জের দিনারপুরসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আগমন ঘটত। ভাটি অঞ্চল থেকে পাইকাররা নৌকায় করে ধান কিনতে আসতেন। স্থানীয় মাছের জন্যও বাজারটির সুনাম ছিল। এখন অবশ্য আগের মতো জমজমাট না থাকলেও গ্রামীণ হাটের চেহারা পুরোপুরি মুছে যায়নি।

সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা বেড়ে যায়। হাতে ব্যাগ নিয়ে কেনাকাটা শেষে গ্রামের মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যে রওনা দেন। সেসময় প্রাচীন এই হাট যেন আবারও প্রাণ ফিরে পায়। কালের বিবর্তনে অনেক পরিবর্তন এলেও থানার বাজার এখনো টিকে আছে তার ইতিহাস নিয়ে।