টানা বর্ষণের জেরে দেশের পার্বত্য অঞ্চলে ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। গত চার দিনে বান্দরবান, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে এ ধসে অন্তত ২৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। দীঘিনালা-সাজেক সড়কের কবাখালীতে পানি উঠে যাওয়ায় নৌকা দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। বিপুল সংখ্যক পর্যটক সাজেকে আটকা পড়েছেন। পাহাড়ধসের কারণে চট্টগ্রামের সঙ্গে ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, ভারী বর্ষণে চট্টগ্রাম নগরী তলিয়ে গেছে। মিরসরাইয়ের সব ঝরনা এলাকায় বন বিভাগ সাময়িকভাবে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ব্যবস্থা প্রকৃত সমাধান নয়; পাহাড় কাটা বন্ধ না করা পর্যন্ত এই দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

২০০৭ সালের ১১ জুন চট্টগ্রামের সেনানিবাস এলাকার লেবুবাগান, কুসুমবাগ ও বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পাহাড়ধসে ১৩০ জনের বেশি মানুষ প্রাণ হারান। এরপর ২০০৮ সালে কক্সবাজারে চারজন, ২০১০ সালে কক্সবাজার ও বান্দরবানে প্রায় অর্ধশত, এবং ২০১৭ সালের জুনে রাঙামাটি, বান্দরবান ও চট্টগ্রামে ১৩৭ জন নিহত হন। এছাড়া ২০১৮ সালের জুলাইয়ে সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় কালাপাহাড় ধসে ধানিজমি ও বসতবাড়ি চাপা পড়ে যায়। বিগত বছরগুলোর প্রাণহানির হিসাব বলছে, প্রতি বছরই পাহাড়ের কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষগুলো বর্ষায় এই বিপর্যয়ের শিকার হন।

পাহাড়ধসের অন্তর্নিহিত কারণ নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, ৪৫ ডিগ্রির বেশি কোণে পাহাড় কেটে সেগুন, তামাক ও আকাশিয়া গাছের বাণিজ্যিক বাগান তৈরি করা হয়েছে। ফলে পাহাড়ের প্রাকৃতিক বন ও বৃক্ষচ্ছাদন ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি রাষ্ট্র ও বেসরকারি উদ্যোগে ‘উন্নয়নের’ নামে পাহাড়কে মাটির স্তূপ বা অবকাঠামো বাণিজ্যের জায়গায় পরিণত করা হয়েছে। পাহাড়ের মাটি চেনে না এমন গাছের বাগান ও বসতি স্থাপনের কারণে ভূমির প্রাকৃতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে এই ‘পুঁজিবাদী চিন্তা’ ধারাবাহিকভাবে পাহাড় ধসিয়ে দিচ্ছে।

পাহাড়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র জাতিসত্তার গভীর সম্পর্ক রয়েছে। চাকমা সমাজে 'নামাচুলগাত' অর্থাৎ যেখানে গর্ত থাকে এবং বৃষ্টির পানি তলদেশ পর্যন্ত গড়িয়ে পড়ে সেসব পাহাড়ে জুম চাষ নিষিদ্ধ। বান্দরবানের রেমেক্রী-প্রাংসা ইউনিয়নের তজিংডং পাহাড়ের নাম মারমা ভাষার, যার অর্থ 'সবুজ পাহাড়'। কেওক্রাডং পাহাড়ের নামও মারমা, যার অর্থ 'পাহাড়ের শীর্ষদেশ'। অথচ ধসে যাওয়া পাহাড়গুলোর স্থানীয় নাম মুছে গিয়ে সেগুলো বাংলা নামে পরিচিত হচ্ছে।

স্থানীয় মানুষ ও গবেষকদের মতে, পাহাড় সুরক্ষায় দেশে কোনো সমন্বিত নীতি নেই। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালায় পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতি ছাড়া পাহাড়-টিলা কাটা নিষিদ্ধ থাকলেও তার প্রয়োগ হচ্ছে না। পাহাড় বাঁচাতে গিয়ে একজন বন কর্মকর্তাও নিহত হয়েছেন। তাই দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য পাহাড়ের লোকায়ত জ্ঞান, পরিবেশগত ভারসাম্য ও সাংস্কৃতিক পবিত্রতাকে মাথায় রেখে একটি 'জাতীয় পাহাড় ব্যবস্থাপনা নীতিমালা' প্রণয়নের দাবি জোরালো হচ্ছে।