মহাকাশ বিজ্ঞানে এক বিরল ধাঁধার সৃষ্টি করেছে টিওআই-২১৫৫বি নামের একটি মহাজাগতিক বস্তু। পৃথিবী থেকে প্রায় ১,৩৫০ আলোকবর্ষ দূরের একটি নক্ষত্রজগতে অবস্থিত এই বস্তুটির প্রকৃতি নিয়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দ্বিধায় রয়েছেন। এটি নক্ষত্র নাকি বাদামি বামন—এখনো নিশ্চিত করে বলা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল জার্নাল-এ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে এই অনিশ্চয়তার কথা স্বীকার করেছেন বিজ্ঞানীরা।

টিওআই-২১৫৫বি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে নাসার টেস স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন গ্রাউন্ড-বেজড টেলিস্কোপের মাধ্যমে। প্রত্যক্ষভাবে দেখা না গেলেও এর অস্তিত্ব নিশ্চিত করা গেছে মাতৃনক্ষত্রের আলোর সূক্ষ্ম পরিবর্তন মেপে। যখন ছোট বস্তুটি তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যায়, তখন আলোর তীব্রতা সামান্য কমে যায়—এই পদ্ধতিতেই এর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়।

আকারে এটি প্রায় সৌরজগতের বৃহস্পতি গ্রহের সমান। তবে সবচেয়ে চমকে দেওয়ার তথ্য হলো এর ভর। বৃহস্পতির ভরের তুলনায় এটি প্রায় ৮০.৬ গুণ বেশি ভারী। বিজ্ঞানীদের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, কোনো বস্তুর ভর যদি বৃহস্পতির ভরের ৭৫ থেকে ৮০ গুণ হয়, তাহলে সেটি নক্ষত্র হিসেবে জ্বলে ওঠার জন্য উপযুক্ত। কিন্তু টিওআই-২১৫৫বি ঠিক এই সীমারেখায় অবস্থান করছে, যার ফলে এটি নক্ষত্র না বাদামি বামন—তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

নক্ষত্র ও বাদামি বামনের মধ্যে পার্থক্য বোঝার জন্য জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি নির্দিষ্ট ভরসীমা খুঁজছেন। নক্ষত্রের ভেতরে মহাকর্ষীয় চাপের কারণে হাইড্রোজেন পরমাণু ফিউশন প্রক্রিয়ায় হিলিয়ামে পরিণত হয়, যা প্রচণ্ড তাপ ও আলো সৃষ্টি করে। অন্যদিকে, বাদামি বামন বা ব্রাউন ডোয়ার্ফ হলো ব্যর্থ নক্ষত্র—এদের ভেতরে পর্যাপ্ত ফিউশন শুরু না হওয়ায় ধীরে ধীরে ঠান্ডা হয়ে যায় এবং কেবল টিমটিমে ইনফ্রারেড আলো বিকিরণ করে।

টিওআই-২১৫৫বি-র ভর ও অন্যান্য বৈশিষ্ট্য দেখে মনে হচ্ছে এটি সবচেয়ে ভারী বাদামি বামন অথবা সবচেয়ে হালকা নক্ষত্র হতে পারে। তবে আধুনিক তাত্ত্বিক মডেল বলছে, শুধু ভর নয়—বয়স, রাসায়নিক গঠন ও বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্যও এই নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। এ কারণেই বিজ্ঞানীরা এখনো একমত হতে পারেননি যে, ঠিক কোন সীমারেখায় একটি বস্তু পুরোপুরি নক্ষত্রে পরিণত হয়।

মহাবিশ্বে ভরের এই ট্রানজিশন জোনে থাকা বস্তু অত্যন্ত বিরল। গবেষকরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই সীমানায় আরও বস্তু আবিষ্কৃত হলে নক্ষত্র জন্মের রহস্য উন্মোচিত হতে পারে। তবে শুধু একটি বস্তু দিয়ে পুরো ধাঁধার সমাধান সম্ভব নয়—আরও তথ্য ও পর্যবেক্ষণের অপেক্ষায় আছেন বিজ্ঞানীরা। সূত্র: দ্য কনভার্সেশন।