পান্ডার খাদ্যাভ্যাস নিয়ে বিজ্ঞানীদের ধাঁধার শেষ নেই। ট্যাক্সোনমিক শ্রেণিবিন্যাস অনুযায়ী এই প্রাণীটি সম্পূর্ণ মাংসাশী। বাঘ, ভালুক ও সিংহ যেখানে কার্নিভোরা বর্গের অন্তর্ভুক্ত, পান্ডাও সেই একই বর্গের সদস্য। মাংস ছেঁড়ার উপযোগী দাঁত, মাংস হজমের জন্য উপযুক্ত পাকস্থলী ও অন্ত্রের গঠন—সবকিছুই মাংসাশী প্রাণীর মতো। কিন্তু বছর বছর ধরে এটি কেবল বাঁশ খেয়েই জীবনযাপন করছে। এ প্রশ্ন বিজ্ঞানীদের কাছে নতুন নয়; বরং কয়েক দশক ধরে একটি উন্মুক্ত ধাঁধা হয়ে আছে।

পান্ডার পাকস্থলী ছোট ও সরল, খাবার দ্রুত পার করে দেওয়ার উপযোগী—যা মূলত মাংসাশী প্রাণীর বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে গরু বা ভেড়ার মতো তৃণভোজীদের পেটে দেখা যায় বহু প্রকোষ্ঠের জটিল কাঠামো ও দীর্ঘ অন্ত্র। পান্ডার অন্ত্রের ভেতরের জীবজগৎও একই চিত্র তুলে ধরে। সেখানে ই-কোলাই ও স্ট্রেপ্টোকক্কাসের মতো ব্যাকটেরিয়ার প্রাধান্য রয়েছে, যা মাংসাশী প্রাণীদের অন্ত্রেই বেশি দেখা যায়। তৃণভোজীদের শরীরে যেসব ফাইবার ভাঙার ব্যাকটেরিয়া থাকে, পান্ডায় তাদের প্রায় দেখা মেলে না।

পান্ডা প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ২০ কিলোগ্রাম বাঁশ গলাধঃকরণ করলেও তার সিকি ভাগও হজম করতে পারে না। বেশির ভাগ পুষ্টি শোষিত না হয়েই মল হিসেবে বেরিয়ে যায়। এই অদক্ষতার মোকাবিলা করতে পান্ডা সহজ একটি কৌশল অবলম্বন করে—শোষণ কম হলে বেশি খেয়ে তার ঘাটতি পুষিয়ে নেওয়া। ফলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনের বড় একটি সময় কেটে যায় কেবল খাওয়ার পেছনে।

খাদ্যাভ্যাসের পেছনে জিনগত কারণও রয়েছে। পান্ডার জিনোমে উদ্ভিদ হজমকারী এনজাইম তৈরির কোনো জিন কখনো ছিল না। কোষীয় পর্যায়েও এই প্রাণী বাঁশ খাওয়ার জন্য তৈরি নয়। শুধু তা-ই নয়, এর স্বাদকোরকের সঙ্গেও ঘটেছে অদ্ভুত এক পরিবর্তন। উমামি রিসেপ্টর নামক যে জিনটি (Tas1r1) গ্লুটামিক অ্যাসিড ও অ্যামিনো অ্যাসিডের স্বাদ শনাক্ত করে, তা পান্ডায় দুটি স্থানে মিউটেশনের কারণে নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে। গবেষণা বলছে, এই নিষ্ক্রিয়তা ঘটেছিল প্রায় ৪২ লাখ বছর আগে, যা জীবাশ্ম রেকর্ডে পান্ডার খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের সময়ের কাছাকাছি। ফলে বাঁশ খাওয়া শুরু হয়েছিল আগে, আর স্বাদ হারানোর ঘটনা ঘটেছে পরে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, বাঁশে অ্যামিনো অ্যাসিড এতই কম থাকে যে এই রিসেপ্টরটির আর কোনো প্রয়োজন ছিল না। জিনটি অকার্যকর হয়ে পড়লে মাংসের প্রতি পান্ডার আকর্ষণও কমে যায়, যা তাদের নিরামিষাশী জীবনযাপনকে আরও সুসংহত করেছে।

পান্ডার আরেকটি বিশেষ অভিযোজন হলো তার থাবার গঠন। অন্যান্য ভালুকের মতো দেখতে হলেও এর কবজির কাছে একটি ছোট হাড় আছে—রেডিয়াল সিসাময়েড। সময়ের সঙ্গে এটি লম্বা হয়ে একটি অতিরিক্ত আঙুলের মতো কাজ করে। মানুষের বিপরীতমুখী বুড়ো আঙুলের অনুপস্থিতিতে এই ছদ্ম-বুড়ো আঙুল বাঁশের ডাল ধরে রাখতে ও চেপে ভাঙতে সাহায্য করে। তবে এই হাড় আসলে নতুন কোনো আঙুল নয়, বরং একটি পুরোনো কবজির হাড় যা বিবর্তনের ধারায় লম্বা হয়েছে।

এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ আছে। পান্ডার বিলুপ্ত আত্মীয় সিমোসিয়নের জীবাশ্মেও একই ধরনের অতিরিক্ত আঙুল পাওয়া গেছে। অথচ সেই প্রাণীটি বাঁশ খেত না; এটি গাছে চড়ে শিকার ধরত। সেখানে হাড়টি সম্ভবত গাছের ডাল আঁকড়ে ধরার কাজে ব্যবহৃত হতো। পান্ডা পরে এই একই হাতিয়ারকে বাঁশ খাওয়ার কাজে লাগিয়েছে। প্রায় ৬০ লাখ বছর আগের প্রাচীন পান্ডা আইলুরার্কটোসের ফসিলেও এই অতিরিক্ত আঙুল পাওয়া গেছে, যা আকারে বর্তমান পান্ডার চেয়েও বড় ছিল। মজার বিষয় হলো, লাখ লাখ বছর পেরিয়ে গেলেও হাড়টি আর লম্বা হয়নি; বরং সামান্য ছোট হয়ে এসেছে। কারণ, এই হাড়কে শুধু বাঁশ ধরার কাজই করতে হয় না; হাঁটার সময় শরীরের ভারও বহন করতে হয়। দুই কাজের মধ্যে একটি সমঝোতা তৈরি হয়েছে।

এই তিনটি বিষয়—মাংসাশীর অন্ত্র, বাঁশ হজমের জিনগত অক্ষমতা ও মাংসের প্রতি স্বাদহীনতা—একসঙ্গে রাখলে দেখা যায় কোনো পরিচ্ছন্ন সমাধান নেই, কেবল কিছু সমঝোতা রয়েছে। পান্ডা প্রায় ২০ লাখ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে বাঁশ খেয়ে টিকে আছে। চীনের পাহাড়ি বনে বাঁশের প্রাচুর্য হজমপ্রক্রিয়ার এই অদক্ষতাকে সযত্নে ঢেকে দিয়েছে।