দেশে অপুষ্টির চিত্র ভয়াবহ, আর এ সমস্যা সমাধানে এখন পর্যন্ত শুধুমাত্র 'ফাঁকা বুলি' আওড়ানো হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন পুষ্টিবিজ্ঞানী ও নীতিনির্ধারকরা। পরিসংখ্যান বলছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চারটি শিশুর একটিই বয়স অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত উচ্চতা পায় না, যা তাদের খর্বকায়তে ভুগছে ইঙ্গিত করে। সোমবার রাজধানীর একটি হোটেলে 'প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি অন্তর্ভুক্তকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এই পরিসংখ্যান ও পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। পুষ্টিবিষয়ক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যখাতের শীর্ষ কর্মকর্তা, গবেষক এবং বেসরকারি সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের সচিবালয়প্রধান সায়কা সিরাজ বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য জরিপের (বিডিএইচএস) তথ্য উপস্থাপন করে বলেন, দেশ ত্রিমাতৃক অপুষ্টির বোঝা বহন করছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পাঁচ বছরের কম বয়সী ২৪ শতাংশই খর্বকায় এবং ১৩ শতাংশ কৃশকায়। একইসঙ্গে, গর্ভবতী নারীদের ৫৩ শতাংশ রক্তস্বল্পতার শিকার, যেখানে প্রজননক্ষম নারীদের ৫৬ শতাংশই স্থূলকায়। সায়কা সিরাজ সমস্যার গভীরে ইঙ্গিত করে বলেন, সাধারণত মানুষ চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে গেলেও পুষ্টিসেবার জন্য নির্দিষ্ট কোনো গন্তব্য নেই। তিনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে দেওয়া পুষ্টিসেবার মান নিয়ন্ত্রণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য তথ্য অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দেন।
শিশুদের খর্বকায় হওয়ার পেছনে শুধু খাবারের অভাব বা সংক্রামক ব্যাধিকে দায়ী করার প্রচলিত ধারণাকে ভুল প্রমাণিত করার চেষ্টা করেন আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআরবি) নির্বাহী পরিচালক তাহমিদ আহমেদ। তিনি ব্যাখ্যা করেন, বিষয়টি ততটা সরল নয়। গবেষণায় উঠে এসেছে যে বিশুদ্ধ পানি, উন্নত পয়োব্যবস্থা ও সুষ্ঠু স্বাস্থ্যবিধি শিশুদের দৈহিক বৃদ্ধিতে বিশাল ভূমিকা পালন করে। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে হামাগুড়ি দেওয়া বা নোংরা হাতমুখ দেওয়ার ফলে ক্ষতিকর জীবাণু শিশুর অন্ত্রের ক্ষতি করে, যার প্রতিফলন ঘটে তার উচ্চতায়। 'নেচার' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি গবেষণার বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, জিডিপির ১ থেকে ২ শতাংশ স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দে খর্যকায় শিশুর হার থাকে ২০ শতাংশ, যা বরাদ্দ ৩ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করলে ১২ শতাংশে নেমে আসে। দেশে বর্তমানে তীব্র মারাত্মক অপুষ্টিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা প্রায় চার লাখ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দীন হায়দার, অতীতের নীতির সমালোচনা করে বলেন, পুষ্টির বিষয়ে কোনো দৃঢ় রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বা ভালো নীতি কখনোই ছিল না, বরং দাতাদের ওপর নির্ভরশীল ছিল এ খাত। ১৯৯১ সালের পরিস্থিতির থেকে তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়নি বলেও তিনি মন্তব্য করেন। বর্তমান সরকারের পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, গ্রামীণ ইউনিয়ন ও শহরী ওয়ার্ডে প্রাথমিক স্বাস্থ্য ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, যেখানে নয়জন করে স্বাস্থ্যকর্মী চিকিৎসা ও প্রতিরোধমূলক সেবা দেবেন, যার অন্তর্ভুক্ত থাকবে পুষ্টিসেবাও। সেবা সহজ করতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তা নেওয়া হবে এবং মাঠ পর্যায়ে নতুন করে আরও এক লাখ কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।
আলোচনা সভায় অন্যান্যদের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, জনস্বাস্থ্য পুষ্টি প্রতিষ্ঠানের পরিচালক ইউনূস আলী শেখ, এবং গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ইম্প্রুভড নিউট্রিশনের (গেইন) কান্ট্রি ডিরেক্টর রুদাবা খন্দকার বক্তব্য রাখেন।



