যশোর সদর উপজেলার জিরাট গ্রামের দুই বাসিন্দা শিরিনা খাতুন ও নূরী খাতুনের একই ধরনের শারীরিক জটিলতা — জরায়ুতে টিউমার। আর্থিক দুরবস্থা ও চরম অসহায়ত্ব তাদের চিকিৎসার পথ বন্ধ করে দিয়েছিল। অবশেষে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন (জেসিএফ) এগিয়ে আসায় তারা অস্ত্রোপচারের সুযোগ পেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই দুই নারী কেবল ব্যতিক্রম নয়; প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাজার হাজার দরিদ্র নারীর স্বাস্থ্যসেবার দায়িত্ব পালন করে আসছে সংস্থাটি।

ছাপ্পান্ন বছর বয়সী শিরিণা খাতুনের সংসার ছিল দারিদ্র্য ও রোগের কষাঘাতে পর্যুদস্ত। তিন দশক আগে সড়ক দুর্ঘটনায় স্বামীকে হারানোর পর শারীরিক প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে পিত্রালয়ে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন তিনি। প্রায় ছয় বছর আগে তার জরায়ুতে টিউমার শনাক্ত হয়। রক্তস্রাব, প্রখর ব্যথা ও টাকার অভাবে তার জীবনযাপন স্তব্ধ হয়ে যায়। চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য তো ছিলই না, উপরন্তু অসুস্থতার দরুন কাজে যেতে না পারায় দারিদ্র্য আরও ঘনীভূত হয়।

একই গ্রামের নূরী খাতুনের পরিস্থিতিও প্রায় অনুরূপ। রোগগ্রস্ত স্বামী ও দুই সন্তানের দায়িত্ব তার কাঁধেই। দ্বিতীয় সন্তান গর্ভে আসার পর জানতে পারেন তিনিও জরায়ুর টিউমারে আক্রান্ত। শারীরিক কষ্ট সত্ত্বেও জীবিকা নির্বাহে একটি মেসে রান্নার কাজ করলেও ঘন ঘন অনুপস্থিত থাকায় চাকরিচ্যুতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।

এই চরম দুঃসময়ে শিরিণা ও নূরীর পাশে দাঁড়ায় জেসিএফ। সংস্থাটির স্বাস্থ্যকর্মীরা সরাসরি যোগাযোগ করে এবং সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তাদের অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা করে। জনপ্রতি পয়ত্রিশ হাজার টাকা ব্যয়ে সফল শল্যচিকিৎসার পর বর্তমানে তারা দুজনেই পুরোপুরি সুস্থ। নতুন করে জীবন ফিরে পাওয়ার অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে শিরিণা খাতুন বলেন, ‘তিন বছর ধরে কঠিন অসুখে ভুগছি। কাজে গেলে নানান অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হতো, যা আমাকে প্রচণ্ড লজ্জা দিত। জাগরণী চক্র ৩৫ হাজার টাকা খরচ করে আমার চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে। এখন আমি সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন কাটাচ্ছি।’

অনুরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নূরী খাতুন মন্তব্য করেন, ‘জাগরণী চক্র এগিয়ে না এলে আমার পক্ষে কখনোই চিকিৎসা করানো সম্ভব হতো না। প্রতিষ্ঠানটি আমাকে নতুন একটি জীবন উপহার দিয়েছে।’ শনিবার সরেজমিনে জিরাট গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, শিরিণা তার ঘরের বারান্দায় বসে তরিতরকারি কাটছেন। পাশেই বসে তার ছেলে মায়ের সাথে গল্প করছে। অন্যদিকে নূরী খাতুনের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, তার দুই সন্তান বারান্দায় বসে খেলায় মত্ত, আর নূরী পাশে দাঁড়িয়ে তাদের খেলা দেখছেন।

জেসিএফ সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির স্বাস্থ্য-সহায়তা কার্যক্রমের আওতায় ২০১৫ সালের প্রারম্ভ থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত প্রায় ২৭ হাজার প্রান্তিক নারীকে বিনা খরচে বিভিন্ন গুরুতর রোগের অস্ত্রোপচার সেবা দেওয়া হয়েছে। এই তালিকায় জরু প্রল্যাপস, জরায়ুর টিউমার ও সংক্রমণে আক্রান্ত ১২,১৬৭ জন নারী আছেন, যারা আরোগ্য লাভের মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনে প্রত্যাবর্তন করেছেন। তাদের পেছনে মোট ৫৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির প্রয়াত প্রতিষ্ঠাতা ও নির্বাহী পরিচালক আজাদুল কবির আরজু এই মহৎ উদ্যোগের সূচনা করেছিলেন গ্রামের অসহায় নারীদের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার উদ্দেশ্যে। বর্তমানে এটি তাদের স্থায়ী কর্মসূচি হিসেবে চলমান। জেসিএফ-এর নির্বাহী পরিচালক মেরীনা আখতার একটি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অজ্ঞতা ও আর্থিক দুরবস্থার কারণে অসহায় নারীরা বছরের পর বছর নিঃশব্দে যন্ত্রণা সয়। জেসিএফ কেবল অর্থের জোগানই নয়, পাশাপাশি মানসম্পন্ন চিকিৎসাও নিশ্চিত করছে।’ চলতি অর্থবছরে এই স্বাস্থ্যসেবা খাতে ১৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।