সোমবার বিকেলে সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন, ২০২৬’-এর খসড়ায় নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পক্ষ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এ তথ্য জানানো হয়।
ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণীত এই আইনে গুমকে একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আইনটির মাধ্যমে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হবে।
খসড়া অনুযায়ী, গুমের অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। আর গুমের ফলে যদি মৃত্যু ঘটে, মরদেহ উদ্ধার করা যায়, অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হয়, তাহলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
আইনের খসড়ায় গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে।
এ ছাড়া ভুক্তভোগীদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যদি তা সম্ভব না হয়, তবে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়া, কেন্দ্রীয় তথ্যভান্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধানও এতে রাখা হয়েছে। তদন্ত সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ১২০ দিন এবং বিচারকাজ সম্পন্ন করতে সর্বোচ্চ ১২০ দিন সময়ের বিধান রাখা হয়েছে। মন্ত্রিসভা এই খসড়া লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগের ভেটিং-সাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন করেছে।
একই বৈঠকে অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ২০২৬ এবং ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ২০২৬ বাতিলের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সরকার নিরাপদ, কার্যকর, মানসম্মত এবং সাশ্রয়ী মূল্যের ওষুধ জনগণের জন্য নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই তালিকা ও পদ্ধতি বাতিলের কারণ হলো, ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩ অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ গ্রহণের বিধান থাকলেও তা প্রতিপালন করা হয়নি। ফলে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা হয়, যা বর্তমানে বিচারাধীন। ইতিমধ্যে গত ২৯ জুন ওষুধ ও কসমেটিকস আইন, ২০২৩–এর বিধান অনুযায়ী জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছে, যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব মন্ত্রিসভা অনুমোদন করেছে। তবে এ বছরের তালিকা ও পদ্ধতি বাতিল হলেও ১৯৯৪ সালের আদেশে প্রণীত অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও সরকারি মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা বহাল থাকবে এবং তালিকা হালনাগাদ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ওষুধের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করা হবে যাতে জনগণের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ে এবং বাজারে সুস্থ প্রতিযোগিতা বজায় থাকে।
পাশাপাশি ‘দ্য ট্রান্সফার অব প্রোপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) অ্যাক্ট, ২০২৬’-এর খসড়াও নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিদ্যমান আইনে সুনির্দিষ্ট বিধান না থাকায় পিতা-মাতা বা দাদা-দাদি কর্তৃক সন্তান বা নাতি-নাতনিকে সম্পত্তি দান করেও নিজ জীবদ্দশায় তা ভোগ-ব্যবহারের আইনি নিশ্চয়তা অর্জন সম্ভব হচ্ছিল না। প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টিকে সুনির্দিষ্ট রূপ ও আইনি সুরক্ষার আওতায় আনা হয়েছে।


