যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান সংঘাত নতুন মাত্রা পেয়েছে। রোববার ভোরে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড ইরানের ভূখণ্ডে ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে, যেখানে মোট ১৪০টি লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করা হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, গোলাবারুদ মজুত, যোগাযোগ সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সামরিক স্থাপনা এই হামলার শিকার হয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, এই হামলা ইরানের সামুদ্রিক পথে হুমকি দেওয়ার সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে।
এই হামলার সূত্রপাত ইরানের একটি কন্টেইনার জাহাজে হামলা থেকে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়ার সময় ওই জাহাজটিতে ইরানি বাহিনী আক্রমণ চালায়, ফলে জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষে ব্যাপক ক্ষতি হয় এবং আগুন ধরে যায়। ওমানের সামুদ্রিক কর্তৃপক্ষ ২৩ জন নাবিককে উদ্ধার করলেও একজন নিখোঁজ রয়েছেন। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে নিখোঁজ ব্যক্তি ভারতীয় নাগরিক, এবং তাকে উদ্ধারে ওমানের সঙ্গে কাজ করছে তারা।
প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থায় ইরান পারস্য উপসাগরের প্রতিবেশী কয়েকটি দেশে হামলা চালিয়েছে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, জর্ডান ও ওমানের কয়েকটি স্থানে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। কাতারের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে, তবে ধ্বংসাবশেষের আঘাতে তিনজন আহত হয়েছেন—তাদের মধ্যে এক শিশুও রয়েছে। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কতা জারি করা হয়, যেখানে মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম ফ্লিট অবস্থান করছে। কুয়েতের সামরিক বাহিনীও তাদের আকাশসীমায় ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে। জর্ডানে তিনটি ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে, তবে এতে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। ওমান ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে এ হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং ইরানের পদক্ষেপকে 'দায়িত্বজ্ঞানহীন' আখ্যা দিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও সতর্কতা জারি হলেও সরকার জানিয়েছে, তাদের ভূখণ্ডে কোনো ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত করেনি।
হরমুজ প্রণালী নিয়ে বিরোধই এই সংঘাতের মূল কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বের মোট বাণিজ্যিক তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুদ্ধ শুরুর পর ইরান এই প্রণালী নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট দেখা দেয়। যদিও যুদ্ধকালীন সময়ে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২০ ডলারে পৌঁছেছিল, বর্তমানে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে। ইরান বলছে, পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত প্রণালী বন্ধ থাকবে এবং আরও হামলার মুখে তারা 'অতিরিক্ত শত্রু ঘাঁটি' লক্ষ্য করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৭ জুন স্বাক্ষরিত অস্থায়ী চুক্তি এখন চরম ঝুঁকির মুখে। এই চুক্তির আওতায় ৬০ দিনের আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার কথা ছিল, কিন্তু হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে মতপার্থক্য আলোচনা প্রক্রিয়াকে প্রায় ভেঙে দিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের ক্বালিবাফ বলেছেন, 'একপাক্ষিক চুক্তির যুগ শেষ', এবং চুক্তি ভঙ্গের মূল্য দিতে হবে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এনবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, 'গতরাত আমরা তাদের ওপর ব্যাপক বোমাবর্ষণ করেছি।' পাকিস্তান, কাতার ও মিসরসহ মধ্যস্থতাকারী দেশগুলো এখনো সমাধানের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি শনিবার প্রথম বিবৃতিতে যুদ্ধের শুরুতে নিহত তার পিতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির প্রতিশোধ নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত বিবৃতিতে তিনি বলেন, প্রতিশোধ 'আমাদের জাতির ইচ্ছা এবং তা অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে'। মার্কিন কর্মকর্তারা অবশ্য দাবি করছেন, রোববারের হামলার পর হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রয়েছে এবং সামুদ্রিক যান চলাচল স্বাভাবিক আছে।


