বিকেলের আলোয় ফরিদপুরের কুমুদিনী কোয়ার্টারে নজরুলের বাড়িতে পৌঁছেছিলেন স্মৃতিকথক ও তার সঙ্গী হাসনাত। সে সময় নজরুল অফিসে ছিলেন। খালাম্মা তাঁদের দেখে সাদরে ডেকে তুলে দিলেন সদ্য তৈরি পাটিশাপটা পিঠা। ক্ষুধার্ত দুই বন্ধু প্লেটের প্রায় সব পিঠাই খেয়ে ফেললেন। খালাম্মার মুখে তখন প্রশান্ত হাসি, তিনি সন্তানের মতোই তাঁদের খাওয়া দেখতে থাকলেন। সেই মমতাময়ী দৃষ্টি আজও চোখে ভাসে লেখকের। নজরুল অফিস থেকে ফিরলে তাঁকে সিগারেটের পয়সা চাইলে তিনি শুধু হো হো করে হেসে ওঠেন। সেই হাসির প্রসন্নতা আল্লাহর বিশেষ দান বলে মনে করেন লেখক। শেষ পর্যন্ত আলীবর্দি খার আমলের যুদ্ধের মতো নানা কসরত করে আট আনা পয়সা জোগাড়ও হয়েছিল।
১৯৮০ সালে একদিন নজরুল প্রস্তাব দিলেন ফরিদপুর যাওয়ার। তাঁর বোন সেখানে থাকেন। বগল বাজিয়ে রওনা দিলেন দুজন। নজরুলের বোনের আপ্যায়নে লেখকের মনে হলো নিজের বাড়িতে বড় বোনের কাছে বসে আছেন। ফরিদপুরে থাকাকালীন রিকশায় চড়ে গেলেন কবি জসীমউদ্দীনের বাড়িতে। দেখলেন তাঁর নক্সী-কাঁথার মাঠ আর সেই বিখ্যাত ডালিমগাছ, যে গাছের তলে কবির দাদির কবর রয়েছে। ইয়াসিকা ক্যামেরায় মুহূর্তগুলো ধারণ করলেন। এক রাতে নজরুলের প্রস্তাবে বন্দুক নিয়ে পদ্মার চরে যাওয়ার দুঃসাহস দেখালেন তাঁরা। ভোরে চরের বালুতে হাবুডুবু খেতে গিয়ে নজরুল চোরাবালিতে আটকে যান। শিকার তো দূর, স্রেফ ঘোরাঘুরিই হলো। বিকেলে চা খেয়ে ব্রিজ নদীর পাড় আর অলিগলি ঘুরে বেড়ানো হতো। হঠাৎ হাসনাতের টেলিগ্রামে সেলিমের জাহাজের খবর পেয়ে ভ্রমণ শেষে ফিরে আসতে হয়।
নজরুল বয়সে বড় হলেও বন্ধুত্বে ভাইয়ের মতো হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ছোট ভাই বাবুল ছিল লেখকের ক্লাসফ্রেন্ড। আরেক ছোট ভাই সিরাজ একটু দুষ্টু স্বভাবের ছিল। শবে বরাতের রাতে কনডেন্সড মিল্কের কৌটার মুখ কেটে তার ভেতরে মোমবাতি জ্বালিয়ে ছোট্ট লন্ঠন বানিয়ে শিশুরা হাঁকত। একদিন নজরুলের বাড়ির কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সিরাজ ওই লন্ঠন লেখকের শার্টে হুক করে দিয়েছিল! লেখক তখন বুঝতেই পারেননি। পরে সিরাজ স্ত্রী ও কন্যাকে নিয়ে সিঙ্গাপুরে চলে গেলে লেখক সেখানে গেলে সিরাজ বিমানবন্দরে গিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। সিরাজের বাসায় ওঠা হলো। সিরাজের মেয়ে আলেয়া আর লেখকের মেয়ে একই বয়সী হওয়ায় দুজনে টেবিলের নিচে খেলতে লাগল। শিশুদের খেলায় ভাষা যে বাধা নয়, সেটা তখন চোখে পড়ল। সিঙ্গাপুরের ডিজনিল্যান্ড, বার্ড পার্কসহ সব ঘোরাঘুরিতে সিরাজই ছিল পথপ্রদর্শক। ফেরার দিন সিরাজের স্ত্রীর বড় বোন নিজে গাড়ি চালিয়ে এয়ারপোর্টে পৌঁছে দেন। তবে গত ২৭ বছরে সিরাজের সঙ্গে আর দেখা হয়নি; করোনাকালে ফোনে কথা হয়েছে। লেখকের ভাষায়, ‘দিনে দিনে বাড়িতেছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ’।




