প্রতিদিন মাত্র ২৫ মার্কিন ডলারের বাজেটে বিশ্ব ঘুরে বেড়াচ্ছেন নিউজিল্যান্ড ও যুক্তরাজ্যের নাগরিক লি ও ম্যান্ডি। তাদের ইউটিউব চ্যানেল ‘ফ্রুগাল ট্রাভেলার্স’-এর মাধ্যমে তারা দেখাচ্ছেন, লাখপতি না হয়েও বুদ্ধিমত্তা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে পৃথিবী দেখা সম্ভব। ‘ফ্রুগাল’ শব্দটি কৃপণতা নয়; অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে জীবনের সবচেয়ে জরুরি স্বপ্ন—ভ্রমণ—কে টিকিয়ে রাখার দর্শন।

এই যাত্রার সূচনা হয়েছিল নেপালের তাতোপানি উষ্ণ প্রস্রবণের পাশে। সেখানেই প্রথম চুম্বন, হিমালয়ের পথে অচেনা ট্রেকারদের মাধ্যমে প্রেমপত্র আদান-প্রদান—সবই যেন কোনো রোমান্টিক চলচ্চিত্রের দৃশ্য। অথচ বাস্তব জীবন কখনো কেবল ভালোবাসার গল্প নয়। পাহাড়ের পথে জন্ম নেওয়া সম্পর্কের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত ছিল। ভারত ভ্রমণের পর একই বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে বিদায় নিতে হয়। একজন নিউজিল্যান্ডে, অন্যজন যুক্তরাজ্যে ফিরে যান। দূরত্ব সবসময় ভালোবাসাকে হারিয়ে দেয় না; কখনো তা আরও নিশ্চিত করে। ম্যান্ডি তিন মাসের জন্য ইংল্যান্ডে যান, পরে ওয়ার্কিং হলিডে ভিসায় আরও কিছুদিন থাকেন। তখনই বুঝতে পারেন, এটি ছুটির দিনের প্রেম নয়; একসঙ্গে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত।

এরপর শুরু হয় অন্য ধরনের ভ্রমণ—নতুন দেশ দেখার জন্য নয়, একই ছাদের নিচে থাকার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য। লি নিউজিল্যান্ডে চলে যান। দুই বছর পর দুজন যুক্তরাজ্যে, তারপর অস্ট্রেলিয়ায়। একের পর এক নতুন দেশ, নতুন কাজ। তিনটি দেশের নাগরিকত্ব অর্জনের পেছনে কেটে গেছে তাদের যৌবনের ১১টি বছর। লি হাসতে হাসতে বলেছিলেন, মানুষ তাদের ছবিগুলো দেখে, কিন্তু ছবির পেছনের দীর্ঘ সংগ্রাম দেখতে পায় না। পাহাড়ের চূড়ায় পৌঁছানোর আগে কতবার পিছলে পড়তে হয়েছে, সেটাও অদৃশ্য থেকে যায়।

অন্যদের মতো তাদেরও ছিল চাকরি, মাসিক বিল, বাড়িভাড়া, কর ও ভবিষ্যতের চিন্তা। অথচ একটি জায়গায় তারা আলাদা—অনেকে বড় বাড়ি বা দামি গাড়ির জন্য সঞ্চয় করেন, তারা জমিয়েছেন পরবর্তী বিমানের টিকিটের জন্য। তাদের কাছে পৃথিবীই ছিল সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

২০১৭ সালে চল্লিশের কোঠায় দাঁড়িয়ে দুজনেই চাকরি ছেড়ে দেন। ম্যান্ডির বয়স ৪৭, লির ৪৬। সন্তান নেই, বিশাল বাড়ির স্বপ্নও নেই। ম্যান্ডি বলেছিলেন, তারা কখনো ধনী ছিলেন না; ছোটবেলা থেকেই শিখেছেন অল্প টাকায় সুন্দরভাবে বাঁচা যায়। তাই অর্থ জমিয়েছেন জিনিস কেনার জন্য নয়, অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য।

ভ্রমণের পদ্ধতিও ব্যতিক্রমী। খুব কমই হোটেলে থাকেন। কখনো কাউচসার্ফিংয়ের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের বাড়িতে, কখনো পেট সিটিং—অর্থাৎ বাড়ির মালিক ও পোষা প্রাণীর দায়িত্ব নিয়ে দেখাশোনা। কখনো ওয়ার্কঅ্যাওয়ের মাধ্যমে দিনে কয়েক ঘণ্টা কাজ করে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। পর্তুগালে প্রায় দেড় বছর বিভিন্ন পরিবারের বিড়াল ও কুকুরের দেখভাল করেছেন। আইসল্যান্ডের একটি খামারে গরু দোহনের কাজও করেছেন। তাদের কাছে এগুলো ত্যাগ নয়; বরং স্থানীয় মানুষের মতো একটি দেশকে জানার সবচেয়ে বড় উপায়।

পাঁচ তারকা হোটেলের বিছানার চেয়ে সাধারণ মানুষের ডাইনিং টেবিলে বসে পাওয়া অভিজ্ঞতাই তাদের কাছে মূল্যবান। কুয়েতে এক পরিবারের সঙ্গে তিন সপ্তাহ থাকার কথা বলতে গিয়ে ম্যান্ডি বলেছিলেন, সেই সময়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যকে যতটা বুঝেছেন, আবুধাবিতে কয়েক সপ্তাহ থেকেও ততটা বোঝেননি। একটি হোটেল বিছানা দেয়; একজন স্থানীয় মানুষ একটি সংস্কৃতি চিনিয়ে দেন।

পাকিস্তানের একটি ছোট দোকানে আপেল কেনার সময় দোকানদার টাকা নিতে অস্বীকৃতি জানান। অনেক অনুরোধে টাকা নিলেও তার চোখেমুখে ছিল অতিথিকে আপ্যায়ন করতে না পারার বেদনা। কুয়েতে প্রথম সকালের নাশতার বিল গোপনে পরিশোধ করেছিলেন এক অচেনা ব্যক্তি। ইরাকি কুর্দিস্তানে জুসের দাম দিতে দেননি কেউ। তাজিকিস্তানে এক পথচারী দুপুরের খাবারের বিল দিয়ে চলে যান। সৌদি আরবে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে অচেনা মানুষ পানি এগিয়ে দেন। প্রতিটি দেশেই শুনেছেন—“আপনারা আমাদের অতিথি।” এভাবেই সংবাদ শিরোনামের চেয়ে সাধারণ মানুষের ভেতরেই একটি দেশের সত্যিকারের পরিচয় খুঁজে পেয়েছেন তারা।

দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সব পরিকল্পনা প্রায় শেষ, ঠিক তখনই ম্যান্ডির শরীরে ধরা পড়ে স্তন ক্যান্সার। সবকিছু থেমে যায়। ফিরে যেতে হয় অস্ট্রেলিয়ায়। অস্ত্রোপচার, চিকিৎসা, অনিশ্চয়তা—জীবন হঠাৎ অন্যদিকে মোড় নেয়। ২০২৩ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর হাসপাতালে ম্যান্ডি বলেছিলেন, বরং তখনই বুঝেছেন জীবন কত ছোট। তাই যতদিন সম্ভব পৃথিবীটাকে দেখে যেতে চান। এই একটি বাক্যই যেন তাদের পুরো জীবনদর্শনকে ব্যাখ্যা করে।

হয়তো সে কারণেই আজ তারা কোনো দেশের উঁচু পাহাড়ের কথা বলার আগে একজন আপেল বিক্রেতার গল্প বলেন। কোনো ঐতিহাসিক স্থাপত্যের আগে মনে রাখেন এক অচেনা মানুষের আতিথেয়তা। কারণ তাদের কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বিস্ময় কোনো পাহাড়, প্রাসাদ বা বিশ্ব ঐতিহ্য নয়; সেই বিস্ময়ের নাম—মানুষ।