বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির একটি সৃজনশীল পথ হিসেবে বিবলিওথেরাপির চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাজ্যে এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তা উল্লেখযোগ্য। ‘বিবলিওথেরাপি’ শব্দটি দুটি গ্রিক শব্দ থেকে গঠিত—‘বিবলিও’ অর্থাৎ বই এবং ‘থেরাপি’ অর্থাৎ চিকিৎসা। এটি মূলত সাহিত্য ও বইয়ের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নয়ন ও আরোগ্যের একটি সৃষ্টিশীল কৌশল। এই পদ্ধতিতে কেবল কথাসাহিত্যই নয়, নন-ফিকশনাল তথ্যমূলক সাহিত্য, বাস্তবধর্মী রচনা এবং আত্ম-উন্নয়নমূলক বইয়ের পরামর্শও দেওয়া হয়। ‘সেলফ-হেল্প’ বা আত্ম-উন্নয়নমূলক সাহিত্যের সুফল সম্পর্কে আগে থেকেই প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। এখন ‘ক্রিয়েটিভ বিবলিওথেরাপি’-র সমর্থকরাও দাবি করছেন যে সাহিত্যভিত্তিক বই থেকেও একই ধরনের উপকার পাওয়া সম্ভব। তাঁদের মতে, কাল্পনিক কাহিনির গভীরে প্রবেশ করলে পাঠক দৈনন্দিন জীবনের কষ্ট থেকে অস্থায়ী মুক্তি পেতে পারেন। আবার বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার আলোকে রচিত গল্প আবেগ বুঝতে ও তা সামলানোর পথ খুঁজে পেতে সহায়তা করে। এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো মানুষের জন্য সত্যিকার অর্থে উপকারী বইয়ের সন্ধান দেওয়া।
২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কানেটিকাট অঙ্গরাজ্যের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা ও গ্রন্থাগারিক Elizabeth Russell বিবাহবিচ্ছেদের মতো কঠিন সিদ্ধান্তের কারণে প্রচণ্ড মানসিক চাপের মুখোমুখি হন। সে সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সৃজনশীল বিবলিওথেরাপি সম্পর্কে জানতে পারেন। এরপর তিনি যুক্তরাজ্যের সাসেক্সের বিবলিওথেরাপিস্ট Ella Berthoud-এর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। Berthoud ‘The Novel Cure’ নামের একটি বইয়ের সহলেখক। Russell-এর পড়ার অভ্যাস ও জীবনের কঠিন পরিস্থিতি জেনে Berthoud তাঁর জন্য প্রাসঙ্গিক বইয়ের একটি তালিকা পাঠান। এই তালিকায় ছিল Nancy Pearl-এর লেখা ‘George and Lizzie’, যেখানে দাম্পত্য জীবনের জটিল সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হওয়া চরিত্রগুলোর অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে শেখার সুযোগ রয়েছে। বইয়ের কাল্পনিক জগতের গভীরে গিয়ে Russell দৈনন্দিন দুঃখ থেকে সাময়িক মুক্তি পান এবং নিজের পরিস্থিতি বুঝতে ও সামলাতে সক্ষম হন; তাঁর একাকিত্বের অনুভূতিও অনেকাংশে হ্রাস পায়।
ধারণা করা হয়, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় সৈন্যদের মানসিক আঘাত ও কষ্ট লাঘবের জন্য কথাসাহিত্য ও তথ্যমূলক বই ব্যবহারের মাধ্যমে বিবলিওথেরাপির উৎপত্তি ঘটে। নব্বইয়ের দশকে এই ধারণা পুনরায় ফিরে আসে। বর্তমানে বিভিন্ন রূপে এটি প্রয়োগ করা হচ্ছে। ২০১৬ সালে British Medical Journal The Lancet-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে দুজন গবেষক উল্লেখ করেন, অনেক দেশে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়বহুল ও অপ্রতুল। সেই প্রেক্ষাপটে বই পড়ার মাধ্যমে মানসিক সহায়তা পাওয়ার ধারণাটি অত্যন্ত চমকপ্রদ ও আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। নাটক, কবিতা বা সাহিত্য যারা ভালোবাসেন, তারা জানেন যে গল্পের মন ও আবেগের ওপর গভীর প্রভাব রয়েছে।
যুক্তরাজ্যের অলাভজনক সংস্থা ‘The Reading Agency’ ২০১৩ সাল থেকে ‘Reading Well’ কর্মসূচির মাধ্যমে ডিমেনশিয়া ও বিষণ্নতায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করে আসছে। সংস্থাটির স্বাস্থ্য ও সুস্থতাবিষয়ক প্রধান Gemma Jolly জানান, বিশেষজ্ঞ ও ভুক্তভোগীদের সহায়তায় সতর্কতার সঙ্গে এই তালিকা বাছাই ও পর্যালোচনা করা হয়। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোর সঙ্গে যৌথ অংশীদারত্বে পরিচালিত এই কর্মসূচির মাধ্যমে এখন পর্যন্ত ৩৯ লাখের বেশি বই ধার দেওয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। যুক্তরাজ্যের কিছু স্বাস্থ্য সংস্থাও গ্রন্থচিকিৎসার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, ইটিং ডিসঅর্ডারের ক্লিনিক্যাল নির্দেশিকায় ‘সেলফ-হেল্প’ বইগুলোকে চিকিৎসার একটি মাধ্যম হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব আত্ম-উন্নয়নমূলক বই সব রোগীর জন্য কার্যকর নাও হতে পারে। স্বাস্থ্যগত কোনো নির্দিষ্ট উদ্বেগ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
NHS-এর জেনারেল ফিজিশিয়ান Andrew Schuman-এর মতে, অন্যান্য চিকিৎসার তুলনায় এই পদ্ধতির সুবিধা হলো এটি নিজের সুবিধামতো সময়ে করা যায়। যখন ইচ্ছা বই পড়া যায়, আবার যখন মানসিক চাপ অনুভূত হয়, তখন তা সরিয়ে রাখা সম্ভব। এই নমনীয়তাই বিবলিওথেরাপিকে অনেকের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, যেকোনো বই পড়াই উপকারী—এই ধারণা সঠিক নয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু কথাসাহিত্য ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১৮ সালে Oxford University-এর গবেষক Trzoskiewicz—যিনি মনোবিজ্ঞান, সাহিত্য ও স্বাস্থ্য মানবিকতায় কাজ করেন—যুক্তরাজ্যের ‘ইটিং ডিসঅর্ডার’-বিষয়ক দাতব্য সংস্থা ‘Beat’-এর সঙ্গে যৌথভাবে প্রায় ৯০০ জনের ওপর একটি জরিপ চালান। অংশগ্রহণকারীদের অধিকাংশই খাদ্যাভ্যাসজনিত সমস্যায় ভুগছিলেন। জরিপে দেখা যায়, যেসব বইয়ে এই সমস্যায় ভোগা চরিত্র ছিল, সেগুলো পড়ার ফলে উপসর্গ আরও বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করেন অংশগ্রহণকারীরা। আশ্চর্যের বিষয় হলো, যেসব উপন্যাস নেতিবাচক অনুভূতি উসকে দেয় বা খাদ্যাভ্যাসের সমস্যা ত্বরান্বিত করে—ঠিক এমন বইগুলোই অনেকে খুঁজে খুঁজে পড়েছেন। আসক্তিতে ভোগা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও একই ধরনের ঝুঁকি থাকতে পারে; মাদক বা নেশাজাতীয় দ্রব্যের অপব্যবহারকারী চরিত্র থাকা উপন্যাস আসক্তিকে উসকে দিতে পারে। সাহিত্য ও মানুষের প্রভাব জটিল ও বহুমুখী হওয়ায় এর ফলাফলও জটিল।
NHS-এর চিকিৎসক Schuman জানান, তিনি কেবল যাদের ভালোভাবে চেনেন, তাদের সঙ্গেই কথাসাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেন। যাঁরা কোনো সাইকোটিক বা মানসিক বিকারজনিত অসুস্থতায় ভুগছেন কিংবা আত্মহত্যার কথা ভাবছেন, তাঁদের কখনোই তিনি বিবলিওথেরাপির পরামর্শ দেন না। কারণ, এটি কেবল ক্ষতিকরই হতে পারে না, চিকিৎসকদের প্রতি রোগীর আস্থাও কমিয়ে দিতে পারে। বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেন যে সবার সমস্যার সমাধান বই নয়; এটি মূলত একটি বাড়তি উপায়। একা একা বই পড়ার চেয়ে দলগত পাঠের ইতিবাচক ফল তুলনামূলকভাবে বেশি। বিষণ্নতায় ভোগা আট সদস্যের দুটি দলের ওপর চালানো একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, এক বছর ধরে কবিতা ও কথাসাহিত্যের দলগত পাঠে অংশ নেওয়ার ফলে তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হয়েছে। দুশ্চিন্তা বা উদ্বেগের সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য নির্দিষ্ট কিছু ধরনের কথাসাহিত্য উপকারী হতে পারে। কারণ, উদ্বেগের মূল কারণ হলো অনিশ্চয়তা। যেমন ঊনবিংশ শতাব্দীর শার্লক হোমস-গোছের গল্পগুলো অনেকের জন্য ইতিবাচক হতে পারে। কারণ, এ ধরনের গল্পে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণের মাধ্যমে জটিল সমস্যার সমাধান করা হয়, যা ভুক্তভোগীকেও নিজের জীবনের সমস্যা সমাধানে উদ্বুদ্ধ করে। সূত্র: BBC




