ইসলামের প্রাথমিক যুগের এক অসাধারণ নারী চরিত্র হলেন উম্মে সালামা (রা.)। তাঁর প্রকৃত নাম হিন্দ বিনতে আবু উমাইয়া। বংশমর্যাদা, সৌন্দর্য এবং তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি বাস্তব জীবনের গভীর অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। আরব সমাজে তাঁর পিতা আবু উমাইয়ার পরিচিতি ছিল ‘যাদুর রাকিব’ তথা ‘কাফেলার অন্নদাতা’ হিসেবে; কেননা সফরে তিনি সমগ্র কাফেলার ভোজনের ব্যবস্থা একাই বহন করতেন, অন্য কাউকে কোনো খাবার বইতে দিতেন না। এমনই এক দানশীল পরিবেশে বেড়ে ওঠেন উম্মে সালামা (রা.)।
ইসলামের প্রচারের সেই একেবারে শুরুর দিকে, যখন নবী করিম (সা.) গোপনে দ্বীনের দাওয়াত দিচ্ছিলেন, উম্মে সালামা ও তাঁর স্বামী আবদুল্লাহ ইবনে আবদিল আসাদ—যিনি আবু সালামা (রা.) নামে পরিচিত—তখনই মুর্শিদবাদীতা পূজার মতো ভিত্তিহীন রীতি ত্যাগ করে এক সর্বশক্তিমানের প্রতি আস্থা রাখেন। আবু সালামা (রা.) ছিলেন নবীজির ফুফাতো ভাই, সম্পর্কে ফুফু আরওয়া বিনতে আবদিল মুত্তালিবের সন্তান। মক্কার অত্যাচার বেড়ে গেলে নবীজির (সা.) উপদেশে হাবশার (বর্তমান ইথিওপিয়া) পথে হিজরতকারীদের মধ্যে তাঁরাও ছিলেন। প্রায়ই ভাবা হয় কেবল অসহায় মুসলিমরাই সে সফরে গিয়েছিলেন, কিন্তু সত্য হলো, উম্মে সালামা ও আবু সালামার মতো প্রভাবশালী ও অভিজাত গোত্রের মানুষেরাও অংশ নেন। তাঁদের উদ্দেশ্য শুধু আত্মরক্ষা ছিল না; বরং আরবের উত্তাল পরিস্থিতি শান্ত করে উপদ্বীপের বাইরেও ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার অভিপ্রায়ে তাঁরা পাড়ি জমিয়েছিলেন। হাবশায় অবস্থানকালে তাঁদের প্রথম সন্তান ‘সালামা’ ভূমিষ্ঠ হয়। কিছুকাল পর মক্কায় ফিরে তাঁরা প্রিয় নবীর কাজে সমর্থন দিতে থাকেন।
মদিনায় হিজরতের অল্প কিছুদিন পরই এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। ওহুদের সংগ্রামে পাওয়া এক আঘাতের জটিলতায় আবু সালামা (রা.) ইন্তেকাল করবেন। চারটি অবুঝ সন্তান নিয়ে উম্মে সালামা এক নিমেষে সহায়হীন হয়ে পড়েন। স্বামীর গুণের কথা স্মরণ করে তিনি বারবার ভাবতেন, ‘আমার আবু সালামার চেয়ে আর উত্তম কে আছ?’ কিন্তু গভীর শোকে কাতর হয়েও তিনি হৃদয়বান হননি। তিনি স্মরণ করলেন স্বামীর কাছ থেকে শিক্ষা করা নবির একটি সুসংবাদ: বিপদে কেউ যদি ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন, আ্লল্লাহুম্মাজুরনি ফি মুসিবাতি ওয়া আখলিফ লি খাইরাম মিনহা’ বলে দোয়া করে, তবে আল্লাহ তাকে বিপদের উত্তম প্রতিদান ও বিকল্প দান করেন।
ইদ্দত শেষে তাঁর গুণগত পরিমাপ দেখে বহু উঁচু মানের বিবাহের প্রস্তাব আসে। আবু বকর (রা.) এবং ওমর (রা.)-এর মতো বিশিষ্ট সাহাবিরাও আগ্রহ প্রকাশ করেন, কিন্তু উম্মে সালামা (রা.) স্বামীর স্মৃতির কারণে বিনীতভাবে সব কটি ফিরিয়ে দেন। কিছুদিন পর স্বয়ং নবীজি (সা.) বিবাহের প্রস্তাব পাঠালেন। এতে তিনি আনন্দিত হলেও নিজের কিছু বৈশিষ্ট্যের জন্য দ্বিধায় পড়লেন। তিনি জানালেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল, আমার তিনটি সীমাবদ্ধতা: আমি একটু আত্মভোলা ও ঈর্ষাপরায়ণ স্বভাবের, আমার বয়স হয়েছে, এবং আমি একাধিক সন্তানের জননী।’ জবাবে নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমার ঈর্ষার ব্যাপারে আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করব। বয়সের ক্ষেত্রে, আমি তোমার চেয়েও বড়। আর সন্তানরা থাকবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের জিম্মায়।’ এই সিদ্ধান্তে বুদ্ধিমতী উম্মে সালামা উপলব্ধি করলেন, তাঁর ধৈর্যের পুরস্কারস্বরূপ সর্বশক্তিমান শ্রেষ্ঠতম স্বামী দান করেছেন। বিয়ে সম্পন্ন হলে তিনি ‘উম্মুল মুমিনিন’-এর গৌরবোজ্জ্বল অভিধা লাভ করলেন।
পরবর্তী জীবনে হোদাইবিয়ার সন্ধির মতো এক জটিল সংকটের সময় উম্মে সালামা (রা.)-এর গভীর বুদ্ধিমত্তা ও যথাযথ পরামর্শই সমগ্র মসলিম জাতিকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের কবল থেকে বাঁচিয়ে তোলে। উম্মে সালামা (রা.)-এর এই জীবন থেকে এক গভীর শিক্ষা বেরিয়ে আসে: জীবনে যত বিধ্বংসী বিপদ বা প্রিয়জনের বিচ্ছেদই আসুক, সর্বশক্তিমানের ওপর নিরঙ্কুশ নির্ভরতা ও অধ্যবসায়ের দৃঢ়তার সাথে ধৈর্য ধারণ করলে, তিনি কাপুরুষের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সবচেয়ে উত্তম বদলা প্রদান করেন।




