ইসলামী পরিভাষায়, নবী-রাসুলগণের সত্যতার প্রমাণস্বরূপ সাধারণ প্রাকৃতিক নিয়মের ব্যতিক্রম হিসেবে সংঘটিত অসাধারণ ঘটনাকে ‘মুজিজা’ আখ্যা দেওয়া হয়। এই অলৌকিক ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নিজস্ব নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়তের সত্যতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে প্রকাশ পায়। প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনেও এমন বহু মুজিজার ছোঁয়া লেগেছে, যার মধ্যে চাঁদ দ্বিখণ্ডিত হওয়া, সামান্য খাদ্য দ্বারা বিপুল সংখ্যক সাহাবির তৃপ্তি এবং মিরাজের অলৌকিক ভ্রমণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তবুও এই দৃশ্যমান মুজিজাগুলো ছিল সময়, স্থান ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, মহামহানবী (সা.)-এর সর্বশ্রেষ্ঠ ও কালোত্তীর্ণ মুজিজা হলো পবিত্র কোরআন। অন্যান্য মুজিজার মতো এটি ক্ষণস্থায়ী নয়; বরং কিয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকা এক জীবন্ত ও সার্বজনীন অলৌকিক বাণী। একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাহীন ‘উম্মি’ নবীর ওপর ভাষা, আইন, নীতি, সামাজিক বিধান ও আধ্যাত্মিকতার অনন্য সমন্বয়ে গঠিত এমন এক মহাগ্রন্থ অবতীর্ণ হওয়াই তার অলৌকিকতার সুস্পষ্ট প্রকাশ। যুগে যুগে নবী-রাসুলদের সমসাময়িক চাহিদা অনুযায়ী বিভিন্ন মুজিজা দেওয়া হয়েছে, যেমন নবী মুসা (আ.)-এর লাঠি বা নবী ইব্রাহিম (আ.)-এর জন্য অগ্নি শীতল হওয়া। কিন্তু কুরআনের অলৌকিকত্ব সব যুগের জন্য প্রযোজ্য। সেই স্বর্ণযুগ, যখন আরবি সাহিত্য ও অলঙ্কারশাস্ত্র চরম উৎকর্ষে ছিল, ঠিক তখনই এই গ্রন্থ একটি প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছিল। শুরুতে পুরো কোরআনের অনুরূপ রচনার আহ্বান জানানো হলেও, পরবর্তীতে চ্যালেঞ্জ কমিয়ে প্রথমে দশটি সুরা এবং সবশেষে মাত্র একটি সুরার মতো অংশ রচনার আহ্বান জানানো হয়। সুরা বাকারা'র ২৩-২৪ নম্বর আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, যদি সন্দেহ হয় তবে একটি সুরা এনে দেখাও, অক্ষম হলে সেই আগুনকে ভয় করো যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। আল্লাহ আরও ঘোষণা দিয়েছেন, ‘বলুন, যদি মানব ও জিন সবাই একত্রিত হয়েও এই কুরআনের অনুরূপ কিছু আনতে চায়, তবে তারা পারবে না।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত: ৮৮)। দে হাজার বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অভাবনীয় উন্নতি সত্ত্বেও এই চ্যালেঞ্জের কোনো জবাব কেউ দিতে পারেনি। কুরআন নিজ ভাষা ও সাহিত্যগুণে সেরা পণ্ডিতদেরও অক্ষম করে দিয়েছে, যার ফলে এটিকে কোনো মানব রচিত সাহিত্য নয়, বরং সরাসরি বিশ্বজাহানের একক স্রষ্টার অমোঘ বাণী হিসেবে প্রমাণিত হয়।
কালজয়ী অলৌকিকতা: কেন পবিত্র কোরআন নবীজির শ্রেষ্ঠ মুজিজা হিসেবে বিবেচিত
মহানবী (সা.)-এর প্রদর্শিত সকল মুজিজার মধ্যে পবিত্র কোরআনকে সর্বশ্রেষ্ঠ ও চিরন্তন নিদর্শন হিসেবে গণ্য করা হয়। এটি সময়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে কিয়ামত পর্যন্ত সমগ্র মানবজাতির জন্য পথনির্দেশিকা, যার কোনো বিকল্প রচনার প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ আজও অক্ষুণ্ন রয়েছে।




