জীবনে ছোট ছোট সৎকর্মের নিয়মিত অনুশীলনই ধীরে ধীরে একজন মানুষকে স্বতন্ত্র ও অনন্য মর্যাদায় আসীন করে। ইসলাম সবসময় বাহ্যিক সৌন্দর্যের চাইতে অন্তরের পবিত্রতা এবং চরিত্রের উৎকর্ষকে অগ্রাধিকার দিয়েছে। সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ রাসুল (সা.)-এর মহিমান্বিত চরিত্রই ছিল অগণিত মানুষকে সত্যের পথে আকৃষ্ট করার মৌলিক অনুপ্রেরণা। এমন নয়টি বৈশিষ্ট্যাবলী নিচে উল্লেখ করা হলো, যা একজন মুমিনকে সুন্দর ব্যাক্তিত্বের অধিকারী হতে সহায়তা করে।
প্রথমত, সততাকে জীবনের মূলভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা। একজন মানুষের সবচেয়ে বড় পুঁজি তার প্রতি অপরের আস্থা, যার উৎস হলো সত্য ভাষণ। যে ব্যক্তি কাজে-কথায় সততা বজায় রাখে, সেই কেবল মানুষের বিশ্বাসভাজন হতে পারে। পবিত্র কোরআনে এসেছে, 'হে মুমিনগণ, আল্লাহকে ভয় কর এবং সত্যনিষ্ঠদের সাহচর্য গ্রহণ করো।' (সুরা তওবা: ১১৯)। মহানবী (সা.) বলেছেন, সত্যবাদিতা কল্যাণের পথ দেখায়, আর সেই পথের পরিণতি জান্নাত। যে ব্যক্তি সার্বক্ষণিক সত্য বলার চর্চা করে, আল্লাহর নিকট তার নাম 'সিদ্দিক' বা পরম সত্যনিষ্ঠ হিসেবে লিপিবদ্ধ হয় (সহিহ বুখারি: ৬০৯৪)। অপরদিকে, মিথ্যাবাদী কিছু সময়ের জন্য ধোঁকা দিতে সক্ষম হলেও, কালক্রমে তার প্রকৃত চরিত্র উদ্ঘাটিত হয়ই।
সময়নিষ্ঠা দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। সময় পৃথিবীর সবচেয়ে অমূল্য সম্পদ। অর্থ পুনরায় উপার্জন সম্ভব, কিন্তু হারানো কোনো মুহূর্ত আর কখনো প্রত্যার্পণযোগ্য নয়। যিনি সময়কে গুরুত্ব দেন, সমাজ তাঁকে দায়িত্বশীল ও পরিণত ভাবে। নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করার এই গুণই মানুষকে সময়নিষ্ঠ ও পরিশ্রমী করে তোলে। রাসুল (সা.) মন্তব্য করেছেন, দুটো নেয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ প্রতারিত: সুস্থ্যতা ও অবসর (সহিহ বুখারি: ৬৪১২)।
তৃতীয়ত, ওয়াদা পালনের অভ্যাস। প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা একজনের নৈতিক শক্তির পরিঘায়ক। যারা কথা দিয়ে কথা রাখেন, তাঁরা পরিবার ও সমাজ উভয় জায়গায় সমানভাবে শ্রদ্ধার পাত্র হন। পবিত্র কুরআনের নিদের্শনায়, 'তোমরা প্রতিজ্ঞা পূর্ণ কর, নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন এ সম্পর্কে তদন্তের সম্মুখীন হতে হবে।' (সুরা বনি ইসরাইল: ৩৪)। রাসুল (সা.) অঙ্গীকার ভঙ্গ করাকে মুনাফিকের আলামত হিসেবে চিহ্নিত করেছেন (সহিহ বুখারি: ৩৩)।
চতুর্থ অভ্যাসটি হলো সদয় আচরণ। মানুষের হৃদয় অধিকার করতে হলে সবচেয়ে প্রয়োজন উত্তম ব্যবহারের। ভদ্রতা কঠিন পাথরকেও বিগলিত করতে পারে, অপরপক্ষে অহংকার মানুষকে পরস্পরের কাছ থেকে বিচ্যু কাঠে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, 'তোমাদের মাঝে আমার সর্বাধিক প্রিয় ও বিচার দিবসে আমার আসনের সর্বোন্নিকটে থাকবে তারাই, যাদের চরিত্র সবচেয়ে উৎকৃষ্ট।' (সুনানে তিরমিজি: ২০১৮)।
পঞ্চম বৈশিষ্ট্য হলো জ্ঞানার্জনের ধারাবাহিক চর্চা। গ্রন্থ অধ্যয়ন, চিন্তা-ভাবনা, অভিজ্ঞজন থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও নিজের ত্রুটি থেকে শিক্ষা নেওয়া-এই সমস্ত কিছুই মানুষকে পরিপক্বতা দান করে। যে শেখা বন্ধ করে, তার ব্যাক্তিত্বের ক্রমবিকাশও একদিন থেমে যায়। পবিত্র কুরআনের ঘোষণা, 'জিজ্ঞেস কর, যারা বুদ্ধি রাখে ও যারা রাখে না, তারা কি কখনো সমান হতে পরে?' (সুরা জুমার: ৯)। রাসুল (সা.) বলেছেন, যে জ্ঞান অন্বেষণে কোনো পথ ধরে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের পথ সহজ করে দেন (সহিহ মুসলিম: ২৬৯৯)।
আত্মনিয়ন্ত্রণ ও ক্রোধ দমন হলো ষষ্ঠ গুরুত্বপূর্ণ অভ্যাস। আবেগের বশে নেওয়া বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই পরে অনুতাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলে বিবেকবান ব্যাক্তি কখনো আবেগকে নয়, বুদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেন। রাগ সংবরণ করার মধ্যেই প্রকৃত সম্মান ও গ্রহণযোগ্যতা নিহিত। মহান আল্লাহ মুক্তিরকদের গুণ বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, 'তারা ক্রোধ হজম করে এবং মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মপরায়ণদের ভালবাসেন।' (সুরা আলে ইমরান: ১৩৪)। মহানবী (সা.)র ভাষ্য, 'সে প্রকৃত পঠাক্ত নয়, যে কুস্তি লড়ে জেতে; বরং প্রকৃত বলবান সেই, যে ক্রোধের ভাবাবস্থায় নিজেকে সামলাতে পারে।' (সহিহ বুখারি: ৬১১৪)।
সপ্তম অভ্যাসটি কৃতজ্ঞতা ও ক্ষমাশীলতা। যে ব্যক্তি আল্লাহর দেওয়া নেয়ামতের শোকরিয়া আদায় করে এবং মানুষের ত্রুটি-বিচ্যুতি মার্জনা করতে শেখে, তার ব্যক্তিত্ত্ব এক অনিন্দ্য রূপ ধারণ করে। কৃতজ্ঞতা মানুষকে বিনী করে, আর ক্ষমা তাকে মর্যাদার শিখরে আসীন করে। কুরআনে ঘোষণা এসেছে, 'যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, তাহলে আমি অবশ্যই তোমাদের আরও বৃদ্ধি দেব।' (সুরা ইবরাহিম: ৭)। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'ক্ষমা করার কারণে আল্লাহ ব্যক্তির মর্যাদা কেবল বর্ধিত করে থাকেন।' (সহিহ মুসলিম: ২৫৮৮)।
অষ্টম অভ্যাস হলো আশাবাদী ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। আশাবাদী মানুয় বিপর্যায়কে নতুন কোনো শিক্ষার সূচনাপর্যায় হিসেবেও দেখে। অভিযোগের পিছিয়ে সময় নষ্ট না করে সমাধানের পথ খোঁজে। এমন মানসিকতা চারপাশের অন্যদেরও অনুপ্রেরণা যোগায়। পবিত্র কুরআন বলে, 'তোমরা আল্লাহর অনুকম্পা থেকে নৈরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমগ্র পাপরাশি ক্ষমা করেন।' (সুরা জুমার: ৫৩)। রাসুল (সা.) বলেছেন, 'মুমিনের বিষয়টি সত্যই বিস্ময়কর। প্রতিটি অবস্থায় তার জন্য কল্যাণ লিখা হয়, যা মুমিন ব্যতীত আর কাউকের ভাগ্যে নেই। সুখ-স্বচ্ছলতা এলে সে কৃতজ্ঞ হয়, সেটা তার জন্য মঙ্গলজনক; আবার দুঃখ-কষ্ট এলে সে ধৈর্য ধরে, সেটিও তার জন্য মঙ্গল বয়ে আনে।' (সহিহ মুসলিম: ২৯৯৯)।
সর্বশেষ, নবম অভ্যাসটি হল প্রত্যহ নিজেকে উন্নত করার প্রয়াস। দ্বিতীয় খলিফা ওমর (রা.) বলেছেন, 'তোমাদের বিচার অনুষ্ঠানের আগেই তোমরা নিজেরই নিজেদের বিচার করো, এবং তোমাদের কর্ম পরিমাণ করার আগেই নিজেরা নিজেরা আমলের পরিমাণ করে নাও।' (সুনানে তিরমিজি: ২৪৫৯ অধীনে বর্ণিত)।
ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রকৃত ব্যক্তিত্ত্বের মাপকাঠি হলো তাকওয়া, সচ্চরিত্র ও সৃষ্টির সেবায় আত্মনিয়োগ। তাই বাহিরের জৌলুষের বদলে যদি আমরা বিশুদ্ধ কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে নিজেদের স্বভাব গঠন করতে পারি, তবে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র— সর্বতেত্রেই ইতিবাচক রূপান্তর সাধিত হবে।




