মানুষের অস্তিত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি সত্য হলো জন্ম ও মৃত্যু। এই অমোঘ বাস্তবতা যুগ যুগ ধরে মানুষকে ভাবিয়ে তুলেছে যে, কেন আমাদের সৃষ্টি, কেন জীবনের পর মৃত্যু নির্ধারিত, এবং মৃত্যুর পরেই কি সব শেষ নাকি এর পেছনে কোনো গভীর উদ্দেশ্য কাজ করে। ইসলামি দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহর সুবিন্যস্ত কৌশল ও সৃষ্টির অপরিহার্য অংশ। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে এ সম্পর্কিত দর্শন, কর্তব্য এবং আখিরাতের নিশ্চয়তা অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় উল্লিখিত হয়েছে। জীবন যেমন একটি মহান আমানত, তেমনি মৃত্যু আল্লাহর অনিবার্য সিদ্ধান্ত।

জীবন ও মৃত্যু সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্য এই যে, ধরনী কোনো চিরস্থায়ী আবাস নয়, এটি একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র। মানুষকে স্বাধীন ইচ্ছাশক্তি প্রদানের মাধ্যমে এখানে প্রেরণের পেছনে মূল রহস্য হলো, সে যেন ভালো ও মন্দের পার্থক্য বুজতে পেরে ইবাদত ও আনুগত্যের পথ বাছাই করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনি সেই সত্তা, যিনি মৃত্যু ও জীবন সৃষ্টি করেছেন, তোমাদের পরীক্ষা করার জন্যে যে তোমাদের মধ্যে কে শ্রেষ্ঠতর কাজে।’ (সূরা মুলক, ২) মানব সৃষ্টির প্রধান লক্ষ্য হলো মহান স্রষ্টার দাসত্ব করা; আর সেই আনুগত্যের বাস্তব প্রতিফলনের জায়গা হচ্ছে পার্থিব জীবন, যেখানে নির্ধারিত হয় কে বিধান মেনে চলল, কে প্রবৃত্তির দাস হলো, কে সৎকর্মে অগ্রসর হলো, আর কে উদাসীন থাকল।

এ ব্যাপারে রাসুল (সা.) এর নির্দেশ হলো, ‘তুমি আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়গুলো থেকে দূরে থাকো, তাহলে তুমি মানুষের মধ্যে সর্বোত্তম ইবাদতকারী হতে পারবে।’ (সুনানে তিরমিজি, ২৩০৫) আল্লাহর নিকট সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী সেই ব্যক্তি, যার অন্তরে তাকওয়া বিদ্যমান। যে পাপ থেকে নিজেকে বাঁচায় এবং আনুগত্যে আন্তরিকতার পরিচয় দেয়।

জীবন ও মৃত্যুর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আল্লাহর হাতে। মানুষ নিজের ইচ্ছায় পৃথিবীতে আসেনি, আবার নিজের ইচ্ছায় চলে যেতেও পারে না। জন্ম থেকে শুরু করে মৃত্যুর প্রতিটি ক্ষণ এবং জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত মহান স্রষ্টার নিয়ন্ত্রণে। বিশ্বের কোনো শক্তিই তাঁর ইচ্ছার বাইরে কাউকে জীবন দিতে বা মৃত্যু থেকে রক্ষা করতে সক্ষম নয়। কোরআনে এসেছে, ‘তোমরা কীভাবে আল্লাহর প্রতি অবিশ্বাস করো? অথচ তোমরা ছিলে নির্জীব, তারপর তিনি তোমাদের জীবিত করেছেন, অতঃপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন ও পুনরায় জীবিত করবেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন।’ (সুরা বাকারা, ২:২৮) অন্যস্থানে বলা হয়েছে, ‘তিনিই জীবন দেন, আর তিনিই মৃত্যু ঘটান এবং রাত ও দিনের পরিবর্তন তাঁরই অধীন।’ (সুরা মুমিনুন, ৮০)

জীবন ও মৃত্যুর এই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ যার হাতে, তার কাছে মানুষের সব দাম্ভিকতা ও ক্ষমতার দাবি অর্থহীন। মানুষ যতই জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে উন্নতি করুক না কেন, নিজ ক্ষমতায় একটি প্রাণ সৃষ্টি করতে পারে না অথবা নির্ধারিত সময় উপস্থিত হলে মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতেও অক্ষম। এই সীমাবদ্ধতাই প্রমাণ করে, জীবন ও মৃত্যু আল্লাহর অনন্ত ক্ষমতা ও সৃজনশীলতার অন্যতম বড় নিদর্শন। যারা পুনরুত্থান অস্বীকার করত, তাদের ভ্রান্ত ধারণার জবাবে কোরআনে বলা হয়েছে, ‘বলুন, যিনি তাদের প্রথমবার সৃষ্টি করেছেন, তিনিই তাদের পুনরায় জীবিত করবেন। আর তিনি সকল সৃষ্টি সম্পর্কে সর্বজ্ঞ।’ (সুরা ইয়াসিন, ৭৯) যিনি মানুষকে শূন্য থেকে সৃষ্টি করেছেন, তার জন্য মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা মোটেও কঠিন নয়; বরং প্রথম সৃষ্টি ও পুনঃসৃষ্টি উভয়ই তার অসীম শক্তির প্রকাশ।

মৃত্যু হলো ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবন থেকে স্থায়ী পরকালীন জীবনে প্রবেশের একটিমাত্র সেতুবন্ধ। মৃত্যুর পর মানুষ ‘বারজাখ’ এর জীবন শুরু করে। একসময় কিয়ামত সংঘটিত হবে, সবাইকে পুনরুত্থান করা হবে, এবং প্রত্যেককে কাজের হিসেবে দিতে হবে। সেদিন বংশ, পদমর্যাদা বা সম্পদ কোনো কাজে লাগবে না; উপকারে আসবে শুধু খাঁটি ইমান ও সৎকর্ম। যারা নির্দেশ মেনে জীবন পরিচালনা করেছে, তাদের জন্য থাকবে চির শান্তির জান্নাত, আর যারা অবাধ্য ছিল, তাদের জন্য কঠোর শাস্তি। ইরশাদ হয়েছে, ‘প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ চাখবে। আর কেয়ামতের দিন তোমাদের কর্মের পূর্ণ বদলা দেওয়া হবে। সুতরাং যাকে জাহান্নাম থেকে সরানো হবে এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হবে, সে-ই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন ধোকার সামগ্রী ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আলে ইমরান, ১৮৫)

সুতরাং জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত এই যাত্রা কোনো নিছক ঘটনা নয়, প্রতিটি পর্যায়েই আছে গভীর অর্থ। যে এই উপলব্ধি জাগায়, তাকে দুনিয়ার সাময়িক ভুলবাল আর বিভ্রান্ত করতে পারে না; বরং সে প্রতিটি দিনকে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহের সুযোগে পরিণত করে। শেষ পর্যন্ত সফলতা তারই হয়, যে তার সমগ্র জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে স্থায়ী জীবনের প্রস্তুতিতে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়।