জীবনে কখনো কখনো এমন দুর্লঙ্ঘ্য বিপদ ও নিঃসঙ্গতা আসে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসার পথ সহজে চোখে পড়ে না। তখন মনের গভীরে প্রশ্ন জাগে, আল্লাহ কি আমাদের ওপর অসন্তুষ্ট? এই সংশয়ের সুযোগ নিয়ে শয়তান বান্দাকে ধোঁকায় ফেলে যে বিপদ কেবলমাত্র আল্লাহর গজব বা ক্রোধের ফল। এর ফলে চরম হতাশা গ্রাস করে, এবং অনেকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরে যায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে বিপদ-মুসিবত কি সর্বদা বান্দার জন্য শাস্তি? ইসলাম এই প্রশ্নের কোনো একক ও নির্দিষ্ট উত্তর দেয় না। মানুষের পক্ষে নিশ্চিত করে জানা সম্ভব নয় যে আল্লাহ কেন একটি নির্দিষ্ট বিপদ পাঠিয়েছেন, কারণ এর প্রকৃত হিকমত একমাত্র তারই জানা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আল্লাহর অনুমতি ছাড়া কোনো বিপদই নেমে আসে না।’ (সুরা আত-তাগাবুন, আয়াত: ১১)
এই প্রসঙ্গে ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.)-এর এক অনন্য মনস্তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রয়েছে। তাঁর মতে, একই বিপদ কারও জন্য রহমত এবং অন্যজনের জন্য শাস্তি হতে পারে। এর নির্ধারক হলো বিপদের সময় মানুষের অভ্যন্তরীণ অবস্থান ও তার প্রতিক্রিয়া। যদি কোনো বিপদ মানুষকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে—তওবা, দোয়া, ইস্তিগফার ও ইবাদতে উদ্বুদ্ধ করে এবং অন্তরে প্রশান্তি এনে দেয়, তবে সেই বিপদ তার জন্য বিশেষ রহমত ও কল্যাণ। অন্যদিকে, যদি সেই বিপদ মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, তাকে অহংকারী, অভিযোগকারী কিংবা হতাশায় নিমজ্জিত করে, তবে তা তার জন্য শাস্তি ও দুর্ভাগ্যের কারণ। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর দেয়া নেয়ামত যেমন কারও জন্য পরীক্ষা বা শাস্তির কারণ হতে পারে, তেমনি বিপদও কারও জন্য আত্মিক উন্নতির সোপান কিংবা ধ্বংসের কারণ হতে পারে। তাই কোনো ঘটনা নিজে থেকে রহমত বা শাস্তি নয়; বরং মানুষের হৃদয়ের অবস্থা ও তার চূড়ান্ত পরিণতিই সেটি নির্ধারণ করে। (ইবনুল কাইয়িম আল-জাওজিয়াহ, আল-ফাওয়ায়েদ, পৃষ্ঠা: ৮২)
পার্থিব জীবনে পরীক্ষা আসবেই। সংকটের সময়ই মানুষের ইমানের প্রকৃত দৃঢ়তা যাচাই হয়। সচ্ছল ও ভালো সময়ে আল্লাহর প্রতি শুভচিন্তা পোষণ করা সহজ, কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইতিবাচক মনোভাব ধরে রাখা কঠিন। কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের পরীক্ষা করব ভয়, ক্ষুধা, জান ও মালের ক্ষতি এবং ফল-ফসল বিনষ্টের মাধ্যমে। তবে সুসংবাদ দাও ধৈর্যশীলদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৫৫) এই আয়াত স্পষ্টভাবে ধৈর্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহর পুরস্কারের ঘোষণা দেয়। যদি জীবনের দুঃখ-কষ্ট, বিপদ কিংবা নিঃসঙ্গতা মানেই শাস্তি হতো, তাহলে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মানব নবী-রাসুলদের জীবনে কোনো দুঃখ-যন্ত্রণা থাকার কথা ছিল না। অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি দুঃখ-কষ্টের সম্মুখীন হয়েছেন। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, ‘আমার বান্দা আমার প্রতি যেমন ধারণা পোষণ করে, আমি তার সাথে তেমন আচরণ করি। সে যখন আমার প্রতি উত্তম ধারণা রাখে, সে উত্তম আচরণ পাবে। আর নেতিবাচক ধারণা রাখলে তেমনটাই পাবে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭৪০৫)
সংকটের মুহূর্তে আল্লাহর রহমত ও দয়ার প্রতি পূর্ণ বিশ্বাস ধরে রাখা জরুরি। বিপদের সময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে, তিনি সেই মুহূর্তেই সৎপথ প্রদর্শন করেন। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে কেউ আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, আল্লাহ তার হৃদয়কে সৎপথ প্রদর্শন করেন।’ (সুরা তাগাবুন, আয়াত: ১১) দ্রুত বিপদ থেকে মুক্তির জন্য কোরআনের ব্যবস্থাপত্র হলো ধৈর্য ও আল্লাহমুখী হওয়া। জীবনে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য থাকলেও যদি হৃদয় আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তবে সেই শূন্যতা পূরণ হয় না। ‘জেনে রাখো, আল্লাহর স্মরণেই হৃদয়সমূহ প্রশান্তি লাভ করে।’ (সুরা রা’দ, আয়াত: ২৮) আর যে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ হয়, তার জন্য সংকীর্ণ জীবন অপেক্ষা করে। (সুরা ত্বহা, আয়াত: ১২৪)
রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন তাঁর কোনো বান্দার কল্যাণ চান, তখন দুনিয়াতেই তাকে দ্রুত কষ্টে ফেলেন (যাতে তার পাপ দূর হয়ে যায়)।’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৩৯৬) এর মাধ্যমে বোঝা যায়, দুনিয়ার দুঃখকষ্ট পাপ মোচনের মাধ্যম। আল্লাহ বান্দার শাস্তি দিতে চান না, বরং চান তিনি যেন আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করে। কোরআনে বলা হয়েছে, ‘তোমাদের শাস্তি দিয়ে আল্লাহ কি করবেন, যদি তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো এবং ইমান আনো?’ (সুরা নিসা, আয়াত: ১৪৭) তাই আল্লাহর শাস্তির জন্য নিষ্ক্রিয় অপেক্ষা না করে, ভুল হলেই ক্ষমা প্রার্থনা করা, ধৈর্য ধরা এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই মুমিনের কর্তব্য। বিপদ যদি মানুষকে আল্লাহর নিকটবর্তী করে, তবে তা আশীর্বাদ; আর যদি দূরে সরিয়ে দেয়, তবেই তা কঠিন সতর্কবার্তা।




