চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হরিণখাইন গ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ধর্মীয় স্থাপনা আজও নীরবে বহন করে চলেছে দুই শতাব্দীর অধিক সময়ের ইতিহাস। স্থানীয়ভাবে ‘কুরা কাটনী মসজিদ’ নামে পরিচিত এই প্রাচীন স্থাপনার প্রকৃত নাম লাকসা জামে মসজিদ। প্রায় ২১৭ বছর আগে নির্মিত এই মসজিদ চট্টগ্রামের মুসলিম ঐতিহ্য, সুফিপ্রভাব ও মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলার এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
বাংলাদেশের বহু প্রাচীন মসজিদ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংস্কার, পুনর্নির্মাণ কিংবা আধুনিক স্থাপত্যের প্রভাবে তাদের আদি বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে। হরিণখাইনের কুরা কাটনী মসজিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন। মসজিদের মূল ভবনটি এখনো তার প্রাচীন রূপ ধারণ করে আছে। মূল গঠন, গম্বুজ, মিনার, খিলান ও কারুকাজ আজও নির্মাণকালের সাক্ষ্য বহন করছে। মসজিদের ধারণক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য পার্শ্ববর্তী অংশে সম্প্রসারণ করা হলেও মূল স্থাপনাটিকে অক্ষত রাখা হয়েছে। বর্তমানে এই মসজিদ স্থানীয় জনগণের নিকট যেমন ধর্মীয় মর্যাদার প্রতীক, তেমনি ইতিহাসপ্রেমী, স্থাপত্যগবেষক এবং দর্শনার্থীদের কাছেও একটি আকর্ষণীয় স্থান।
স্থানীয় বংশধরদের সূত্রে জানা যায়, ইরানের খোরাসান অঞ্চল থেকে মাবুদ খোরাসানি (খোশা মাবুদি) নামের এক ধর্মপ্রাণ ব্যক্তি বাংলায় আগমন করেন। তাঁর পুত্র আবদুল ওহাব মুন্সি পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের বিখ্যাত সুফি ব্যক্তিত্ব হজরত শাহসুফি আমানত শাহ (রহ.)-এর সান্নিধ্য লাভ করেন। ধর্ম প্রচার এবং ইসলামের শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে হজরত আমানত শাহ (রহ.) আবদুল ওহাব মুন্সিকে চট্টগ্রামের পটিয়া অঞ্চলে প্রেরণ করেন। তিনি শুধু ধর্মীয় দায়িত্বই পালন করেননি, বরং স্থানীয় মুসলিম সমাজের জন্য একটি জামে মসজিদ নির্মাণের উদ্যোগ নেন। অবশেষে ১২২২ হিজরি (১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দ) সালে আবদুল ওহাব মুন্সির উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় লাকসা জামে মসজিদ। ইতিহাসের বিচারে এটি এমন এক সময়ের নির্মাণ, যখন বাংলায় মোগল শাসনের শেষ অধ্যায় চলমান ছিল এবং স্থানীয় সমাজে সুফি ধর্মপ্রচারকদের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। এই মসজিদের ইতিহাস তাই শুধু একটি স্থাপনার ইতিহাস নয়; বরং এটি খোরাসান থেকে বাংলায় আসা সুফি-ঐতিহ্য ও ইসলামি সংস্কৃতির বিস্তারেরও একটি স্মারক।
লাকসা জামে মসজিদ আনুষ্ঠানিক নাম থাকলেও স্থানীয় জনগণের কাছে এই মসজিদ অধিক পরিচিত ‘কুরা কাটনী মসজিদ’ নামে। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় মুরগিকে ‘কুরা’ বলা হয়। প্রচলিত জনশ্রুতি অনুসারে, মসজিদটি উদ্বোধনের পর পরবর্তী টানা সাত দিন ব্যাপক আয়োজনের মাধ্যমে মেজবানের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। দূরদূরান্ত থেকে আগত অতিথিদের আপ্যায়নের জন্য প্রতিদিন অসংখ্য মুরগি জবাই করা হতো। তৎকালে হরিণখাইন ও আশপাশের এলাকায় হিন্দু ও বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের সংখ্যাই ছিল বেশি। নতুন নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই স্থাপনা দেখার জন্য শুধু মুসলমান নয়, অন্যান্য ধর্মের মানুষও এখানে ভিড় জমাত। অনিন্দ্য সুন্দর কারুকার্যখচিত এমন স্থাপনা এলাকাবাসীর কাছে ছিল অত্যন্ত বিরল। মুরগি জবাই ও মেহমানদারির এই বিরাট আয়োজন জনমনে এতটাই আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল যে সময়ের পরিক্রমায় মানুষ মসজিদটিকে ‘কুরা কাটনী মসজিদ’ বলেই ডাকতে শুরু করে। ক্রমে সেই নামই হয়ে ওঠে এর সর্বাধিক পরিচিত নাম।
কুরা কাটনী মসজিদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর শিল্পসমৃদ্ধ স্থাপত্য। মসজিদের বিভিন্ন কারুকাজ পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, মসজিদটির স্থাপত্যে মোগল ও আঞ্চলিক বাংলার স্থাপত্যরীতির এক চমৎকার সংমিশ্রণ ঘটেছে। মসজিদটিতে রয়েছে ৩টি গম্বুজ, ৪টি অলংকৃত মিনার, ২টি অভ্যন্তরীণ খিলান, ১১টি ভিন্নধর্মী অলংকরণ নকশা, একাধিক কারুকাজখচিত কার্নিশ ও নান্দনিক প্রবেশপথ। মধ্যবর্তী গম্বুজটি আকারে সবচেয়ে বড়, যা মসজিদের মূল কেন্দ্রবিন্দু। উভয় পাশে তুলনামূলক ছোট দুটি গম্বুজ স্থাপন করা হয়েছে। গম্বুজগুলোর গঠনে পাওয়া যায় মোগল স্থাপত্যের প্রভাব, তবে অলংকরণের মধ্যে স্থানীয় শিল্পরীতির স্পষ্ট ছাপ রয়েছে। গম্বুজের নিচে সারিবদ্ধ খাঁজকাটা নকশা ও কার্নিশের অলংকরণ পুরো মসজিদজুড়ে একধরনের ছন্দ সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে মিনারগুলোর গায়ে সর্পিল খোদাইকৃত নকশা অত্যন্ত আকর্ষণীয়, যা অন্য অনেক প্রাচীন মসজিদে সচরাচর দেখা যায় না।
মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করলে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত হতে হয় এর অলংকরণ দেখে। প্রায় দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সংস্কারবিহীন অবস্থায় থাকা সত্ত্বেও অনেক নকশা এখনো অবিকৃত রয়েছে। মসজিদের ১১টি নকশা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রতিটি নকশা একে অপরের থেকে ভিন্ন। এই ভিন্নতা থেকে নির্মাতাদের শিল্পদক্ষতা ও সৃজনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। মসজিদের মেহরাবে অন্তত পাঁচ ধরনের স্বতন্ত্র নকশা লক্ষ করা যায়। ফুল, জ্যামিতিক রেখা, খিলানভিত্তিক মোটিফ ও অলংকরণধর্মী নকশার সমন্বয়ে তৈরি এই শিল্পকর্মগুলো স্থানীয় কারিগরদের অসাধারণ দক্ষতার সাক্ষ্য বহন করে। অভ্যন্তরের খিলানগুলোতেও রঙিন নকশা ও অলংকরণের ছাপ এখনো বিদ্যমান, যা মসজিদের নান্দনিক মূল্যকে বহুগুণ বৃদ্ধি করেছে।
বাংলাদেশের আবহাওয়া অত্যন্ত আর্দ্র ও বর্ষাপ্রবণ। ফলে শত শত বছর ধরে একটি স্থাপনা বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া টিকে থাকা অত্যন্ত বিস্ময়কর। কুরা কাটনী মসজিদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, প্রায় ২১৭ বছর ধরে মূল কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে। দেয়াল, গম্বুজ, মিনার, কার্নিশ ও কারুকাজের বড় অংশ এখনো নির্মাণকালের ঐতিহ্য বহন করছে। ১৯৭৫ সালের আগে মসজিদটিতে উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ হয়নি। মুসল্লির সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে পরবর্তীকালে উত্তর ও পূর্ব পাশে বর্ধিত অংশ নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে পশ্চিম পাশে নতুন ভবনের কাজ চলমান থাকলেও মূল ঐতিহাসিক অংশটিকে অপরিবর্তিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। এটি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ঐতিহ্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত।
মসজিদ প্রতিষ্ঠার সময় একটি ফারসি ভাষার শিলালিপি বা ফলক স্থাপন করা হয়েছিল। ওই ফলকে উল্লেখ ছিল—‘দ্বিতীয় আকবর শাহের রাজত্বকালে মাবুদ খোরাসানির পুত্র আবদুল ওহাব কর্তৃক ১২২২ হিজরিতে এই মসজিদ স্থাপিত হয়।’ এই ফলক একসময় মসজিদে সংরক্ষিত থাকলেও বর্তমানে তা অনুপস্থিত। স্থানীয়দের বক্তব্য অনুযায়ী, এক ব্যক্তি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় জাদুঘরে সংরক্ষণের কথা বলে ফলকটি নিয়ে যান। পরবর্তীকালে অনুসন্ধান করে জানা যায়, সেটি জাদুঘরে জমা দেওয়া হয়নি। ঐতিহাসিক এই ফলকের হারিয়ে যাওয়া নিঃসন্দেহে স্থানীয় ইতিহাসের জন্য একটি বড় ক্ষতি।
এই মসজিদের তথ্য প্রথম বিশদভাবে প্রকাশ করেন গবেষক হামীদুল্লাহ খান বাহাদুর। তাঁর রচিত ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আহাদিসুল খাওয়ানিন’-এ মসজিদের ফারসি ফলকের পাঠ ও ইতিহাস সংরক্ষিত রয়েছে। এ ছাড়া ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস (পুরানা আমল)’ এবং ‘পটিয়ার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ গ্রন্থেও মসজিদটি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, কুরা কাটনী মসজিদ শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য নয়; বরং চট্টগ্রামের ইসলামি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পটিয়ার হরিণখাইনের কুরা কাটনী মসজিদ বাংলাদেশের প্রাচীন স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক অমূল্য সম্পদ। ১৮০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত এই মসজিদ আজও তার আদি কাঠামো, কারুকাজ ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অক্ষুণ্ন রেখে দাঁড়িয়ে আছে। তিন গম্বুজবিশিষ্ট এই প্রাচীন স্থাপনা শুধু ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং চট্টগ্রামের ইতিহাস, সুফি সংস্কৃতি, লোককথা এবং মধ্যযুগীয় স্থাপত্যকলার এক জীবন্ত দলিল। যথাযথ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, গবেষণা এবং সরকারি সংরক্ষণ উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে কুরা কাটনী মসজিদ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল সাক্ষ্য হিসেবে আরও দীর্ঘকাল টিকে থাকবে। ২১৭ বছরের পুরোনো এই স্থাপনাকে জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে যথাযথভাবে সংরক্ষণ ও পরিচিত করে তোলা এখন সময়ের দাবি।




