ফজরের পর থেকে একটানা কাজ, পড়াশোনা বা সংসারের দায়িত্ব সামলানোর পর বেলা দুইটা বা তিনটার দিকে শরীর ও মন বিশ্রাম চায়। অনেকেই তখন কড়া চা বা কফি দিয়ে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করেন। কিন্তু প্রিয় নবী (সা.) এ সময়ের জন্য একটি সহজ, স্বাস্থ্যকর ও প্রশান্তিকর অভ্যাস শিখিয়ে গেছেন, যা শরীরকে সতেজ করে এবং ইবাদতের শক্তি জোগায়। আরবিতে এই অভ্যাসের নাম কায়লুলা। ‘কায়লুলা’ শব্দের অর্থ দুপুরের দিকে অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম বা হালকা ঘুম। এটি শুধু ঘুমের নাম নয়; বরং শরীরকে আরাম দেওয়া ও শক্তি ফিরে পাওয়ার উদ্দেশ্যে স্বল্প সময়ের বিশ্রামও এর অন্তর্ভুক্ত। ঘুম না এলেও কিছুক্ষণ শান্ত হয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও কায়লুলার উদ্দেশ্য পূরণ হয়।

কায়লুলা সবার জন্যই উপকারী, তবে যাদের দিন খুব ভোরে শুরু হয়, তাদের জন্য এটি আরও প্রয়োজনীয়। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি অনুযায়ী, দুপুরের দিকে সতর্কতা ও শক্তির মাত্রা কিছুটা কমে আসে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে ‘পোস্ট-লাঞ্চ ডিপ’ বা দুপুরের স্বাভাবিক শারীরিক অবসাদ বলা হয়। এ সময় ১৫-২০ মিনিটের কায়লুলা ব্রেনকে সতেজ করতে ও কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক। তাই সারা দিন ঘরের কাজে ব্যস্ত মা, সকালে পড়াশোনায় ব্যস্ত শিক্ষার্থী বা ফজরের পর থেকেই কর্মব্যস্ত মানুষ—সবার জন্যই দুপুরের এই ১৫ থেকে ৩০ মিনিটের কায়লুলা কোনো বিলাসিতা বা আলসেমি নয়, বরং শরীর ও মনের একটি স্বাভাবিক প্রয়োজন।

কায়লুলা শরীর ও মনকে ভালো রাখে বিভিন্ন উপায়ে। এটি স্নায়ুর ক্লান্তি দূর করে, কারণ ভোর থেকে একটানা কাজের ফলে ব্রেন ও স্নায়ুতন্ত্র ক্লান্ত হয়ে পড়ে এবং কায়লুলা সেই ক্লান্ত ব্রেনকে কিছু সময়ের জন্য বিশ্রাম দিয়ে আবার নতুন উদ্যমে কাজ করার শক্তি জোগায়। এটি বিকেলের অলসতা ও খিটখিটে ভাব কমায়। ফজরে ওঠা মানুষ বা ব্যস্ত মায়েরা বিকেলের দিকে ঝিমুনি, অবসাদ ও মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত। দুপুরের অল্প বিশ্রাম মনকে প্রফুল্ল রাখে, মেজাজ সতেজ করে এবং নতুন কর্মোদ্যম এনে দেয়। এছাড়া, কায়লুলা ইবাদতের শক্তি জোগায়। পরিশ্রমে ক্লান্ত শরীর নিয়ে সন্ধ্যার পর ইবাদতে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। কায়লুলা শরীরকে ঝরঝরে করে তোলে, যা মাগরিব, এশা, তাহাজ্জুদ ও রাতের ইবাদতে একাগ্রতা অর্জনে সহায়তা করে। এ কারণেই অনেক আলেম কায়লুলাকে শুধু শারীরিক বিশ্রাম নয়, বরং ইবাদতের প্রস্তুতির একটি মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনুল কাইয়িম (রহ.) এর মতে, কায়লুলা শরীরের স্বাভাবিক ভারসাম্য বজায় রাখতে, ক্লান্তি দূর করতে এবং রাতের ইবাদত, বিশেষ করে তাহাজ্জুদের জন্য শরীরকে প্রস্তুত রাখতে সহায়তা করে।

ইসলামে কায়লুলার গুরুত্ব অপরিসীম। এটি সাহাবিদের জীবনের পরিচিত একটি সুন্নত অভ্যাস। আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘সাহাবিরা জুমার দিন জুমার নামাজের আগে দুপুরের খাবার ও কায়লুলা করতেন না, বরং জুমার নামাজের পর তা করতেন।’ (সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৯৩৯) আরেকটি বর্ণনায় এসেছে, ‘তোমরা কায়লুলা করো। কারণ, শয়তান কায়লুলা করে না।’ (আত-তাবারানি, আল-মুজামুল আওসাত) ইমাম ইবনে রজব (রহ.) উল্লেখ করেছেন, ‘পূর্বেকার আলেমদের অনেকে কায়লুলাকে কিয়ামুল লাইল (রাতের নামাজ) সহায়ক একটি অভ্যাস হিসেবে গুরুত্ব দিতেন। কারণ, দিনের এই স্বল্প বিশ্রাম রাতের দীর্ঘ ইবাদতে মনোযোগ, কর্মশক্তি ও একাগ্রতা বজায় রাখতে সহায়ক হতে পারে।’

কায়লুলার সঠিক নিয়ম খুবই সহজ। সর্বোচ্চ উপকার পেতে কয়েকটি বিষয় খেয়াল রাখা ভালো। সময়কাল: জোহরের নামাজের আগে বা পরে সুযোগ বুঝে মাত্র ১৫-৩০ মিনিটের জন্য কায়লুলা করুন। সাধারণত দুপুর ১২টা ৩০ মিনিট থেকে বেলা ৩টার মধ্যে এটি করা সুবিধাজনক। এর বেশি সময় ঘুমালে অনেকের ক্ষেত্রে শরীর ভারী লাগতে পারে এবং ঘুম ভাঙার পর অলসতা অনুভূত হতে পারে। এ ছাড়া ঘুম বেশি হলে রাতে অনিদ্রা ও ঘুমের ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। পরিবেশ: শান্ত, আরামদায়ক ও নিরিবিলি একটি স্থানে বিশ্রাম নিন। চাইলে আলো কিছুটা কমিয়ে এবং মুঠোফোন দূরে রেখে বিশ্রাম নিতে পারেন, যাতে শরীর ও মন দ্রুত শান্ত হয়। ঘুম না এলেও ক্ষতি নেই: ঘুম না এলেও কোনো সমস্যা নেই। শুধু শরীরটাকে ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকলেও শরীর ও মন অনেকটাই সতেজ হয়ে উঠতে পারে, ইনশা আল্লাহ।