আর্থিক খাতের প্রতিষ্ঠান উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদে বড় রদবদল ঘটাল বাংলাদেশ ব্যাংক। চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) এবং দুই স্বতন্ত্র পরিচালকের পদত্যাগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রশাসক ও সহকারী প্রশাসক নিয়োগ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত মঙ্গলবার এই নিয়োগ দেওয়া হয়, আর পরদিন বুধবার নবনিযুক্তরা আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নতুন করে নিয়োগ পাওয়া চার কর্মকর্তা হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক মোস্তাকুর রহমান, অতিরিক্ত পরিচালক মোকাদ্দেসুল আলম ও মোশাররফ হোসেন এবং যুগ্ম পরিচালক বিমল কুমার গায়েন। তাঁদের মধ্যে প্রশাসক ও সহকারী প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব ভাগ করে দেওয়া হয়েছে। শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ায় পর্ষদ পুনর্গঠনের এই খবর আজ বৃহস্পতিবার দুই স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে কোম্পানিটি। ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এর আগে গত রোববার একযোগে পদত্যাগ করেন চেয়ারম্যান ও এনআরবিসি ব্যাংকের সাবেক এমডি মো. মুখতার হোসেন, স্বতন্ত্র পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক মো. নিয়ামুল কবির, স্বতন্ত্র পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম এবং এমডি মো. ওয়ালি উল্লাহ। তাঁদের পদত্যাগের ফলে পর্ষদে কেবল দুজন পরিচালক অবশিষ্ট ছিলেন—স্বতন্ত্র পরিচালক মোহাম্মদ শফিউল আজম এবং উত্তরা গ্রুপের সিএফও ও পরিচালক মাহবুব আলম। এতে প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদে কোরাম সংকট দেখা দেয়, যা কাটাতেই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন করে চারজন প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে পর্ষদ পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত নেয়।
উত্তরা ফাইন্যান্সের পর্ষদ পুনর্গঠনের এই ঘটনা নতুন নয়। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে পাঁচ সদস্যের নতুন পর্ষদ গঠন করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সেই পর্ষদে চারজন স্বতন্ত্র পরিচালক এবং উত্তরা গ্রুপের সিএফও মাহবুব আলমকে রাখা হয়েছিল। এমডি হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ওয়ালি উল্লাহ, যিনি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যোগ দিয়েছিলেন।
একসময় আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে উত্তরা ফাইন্যান্সের অবস্থান ছিল শীর্ষে। উত্তরা গ্রুপের মালিকানায় থাকা প্রতিষ্ঠানটির পর্ষদেও ছিল গ্রুপটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা। তবে ধীরে ধীরে নানা আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানটি দুর্বল হতে থাকে। ২০১৯ সালের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীর ভিত্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে আসে একাধিক অনিয়মের চিত্র। আমানতের অর্থ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে না জমিয়ে উদ্যোক্তাদের নিজস্ব কাজে ব্যবহার, কলমানির অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে ব্যক্তিগত কাজে খরচ, অগ্রিম ও প্রিপেমেন্টের নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং ভুয়া এফডিআরের বিপরীতে ঋণ বিতরণের মতো অভিযোগ পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে অন্তত ৩ হাজার ৪৪০ কোটি টাকার অনিয়মের তথ্য পায় বাংলাদেশ ব্যাংক।
এসব অনিয়মের জেরে ২০২২ সালে উত্তরা ফাইন্যান্সের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই বছরের ২৮ ডিসেম্বর উত্তরা গ্রুপ-সংশ্লিষ্ট পাঁচ পরিচালককে অপসারণ করা হয়। এর আগে জুন মাসে তৎকালীন এমডি এস এম শামসুল আরেফিনকেও অপসারণ করেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। সর্বশেষ পদত্যাগ ও প্রশাসক নিয়োগের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কর্তৃত্ব এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে এসেছে।




