পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) সংশোধিত মার্জিন বা ঋণ বিধিমালাকে আগের নীতিমালার তুলনায় অনেক বেশি যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত হিসেবে মূল্যায়ন করেছেন শেয়ারবাজারের একটি সম্পদ ব্যবস্থাপক প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী। তার মতে, নতুন বিধিমালায় বেশ কিছু ক্ষেত্রে বাস্তবতার নিরিখে উন্নতি আনা হয়েছে, যা বাজারসংশ্লিষ্টদের জন্য নিশ্চিতভাবে স্বস্তির। তবে তিনি মনে করেন, কিছু খাতে আরও নিখুঁত ও বাজারবান্ধব করার অবকাশ রয়েছে।

নতুন বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কোম্পানির মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও-৪০-এর শর্ত বহাল রাখা হয়েছে, যা তিনি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন। পাশাপাশি পিই রেশিও হিসাবের পদ্ধতি হিসাবে আগের চার প্রান্তিকের শেয়ারপ্রতি আয় বা ইপিএসের যোগফলকে ভিত্তি ধরা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক রীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে তার পর্যবেক্ষণ। তবে তিনি মত দেন, পিই রেশিওর পাশাপাশি লেনদেনযোগ্য শেয়ারের বাজার মূলধন বা লেনদেনের পরিমাণকে যুক্ত করা গেলে পরিস্থিতি আরও উন্নত হতো। কারণ কম লেনদেন হওয়া এবং কম পিই রেশিওর শেয়ার যখন ফোর্সড সেলের আওতায় আসে, তখন দামে বড় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এমন পরিস্থিতিতে শেয়ারটি মূল্য পতনের সীমা বা সার্কিট ব্রেকারে আটকে গেলে বড় অংকের শেয়ার বিক্রি করা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়ে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, খসড়া বিধিমালায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সম্পদমূল্যের হিসাব রাখার যে প্রস্তাব ছিল, সেটি চূড়ান্ত বিধিমালায় আর রাখা হয়নি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রেক্ষাপটে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ঋণ দেওয়ার সময় সম্পদের মান বা বুক ভ্যালু যাচাই অত্যন্ত জরুরি। এই বিষয়টি বাদ পড়ায় উক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ারের বিপরীতে ঋণ প্রদানে কিছুটা ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে ১:১ অনুপাত, অর্থাৎ ১০০ টাকার বিনিয়োগের বিপরীতে সর্বোচ্চ ১০০ টাকা ঋণ—এই সহজ কাঠামোটি আগের জটিল ব্যবস্থার তুলনায় অনেক ভালো বলে তিনি মন্তব্য করেন। ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মূলধনের চার গুণের বেশি ঋণ বিতরণে নিষেধাজ্ঞা থাকায় তিনি মনে করেন, এটি ঋণদাতাদের ঝুঁকি হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে। শেয়ারবাজার inherently ঝুঁকিপূর্ণ; সেখানে ঋণ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি আরও বাড়ে—এ কথা মাথায় রেখে ঋণদাতা ও ঋণগ্রহীতার ঝুঁকি কমানোর এই উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন।

নতুন বিধিমালায় বিনিয়োগকারীদের বাজারে ন্যূনতম তিন লাখ টাকার নিজস্ব বিনিয়োগ থাকার শর্ত রাখা হয়েছে, যা আগে ছিল পাঁচ লাখ টাকা। এই সীমা কমানোর ফলে আগের চেয়ে অনেক বেশি বিনিয়োগকারী ঋণ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করবেন বলে তিনি মনে করেন। এছাড়া জীবনবিমা কোম্পানির শেয়ারের ক্ষেত্রে পিই রেশিওর বদলে সম্পদমূল্যের ভিত্তিতে ঋণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। তবে তিনি মত দেন, এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কোম্পানির লাইফ ফান্ডের সম্পদের মান যাচাইয়ের শর্ত অন্তর্ভুক্ত করা গেলে তা আরও কার্যকর হতো।

নতুন বিধিমালায় একক কোনো শেয়ারে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তার বিতরণ করা মোট ঋণের ২০ শতাংশের বেশি দিতে পারবে না, যা আগে ২৫ শতাংশ ছিল। এই সিদ্ধান্তটিকেও তিনি যৌক্তিক বলে মনে করেন, কারণ এতে ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ঘনত্বজনিত ঝুঁকি উল্লেখযোগ্য হারে কমবে। পরিশেষে তিনি অতীত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ২০১০ সালের শেয়ারবাজার ধসের পর নেগেটিভ ইকুইটির কারণে বহু ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতা হারিয়েছে। তাই ঋণসুবিধা সহজ করার পাশাপাশি যেন সেই ধারার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেদিকে সবার নজর রাখা দরকার। তিনি বিনিয়োগকারীদের প্রতি আহ্বান জানান, ঋণ নেওয়ার আগে যেন তারা যথেষ্ট বিচক্ষণতা অবলম্বন করেন এবং ঋণ বিতরণের পুরো প্রক্রিয়া নিয়মিত তদারকির আওতায় রাখার পরামর্শ দেন, যাতে দীর্ঘমেয়াদে বাজারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে।