ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের একমাত্র ও শেষ খ্রিষ্টান অধ্যুষিত শহর তাইবেহ এখন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের ক্রমাগত নিপীড়নের শিকার। এক সময়ের নিরিবিলি ও নিরাপদ এই শহরটির বাসিন্দারা বর্তমানে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। গত কয়েক বছর ধরেই অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের তরফ থেকে হামলা, জমি দখল এবং লুটপাটের ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

শহরের প্রান্তে প্রায় ২০ বছর ধরে একটি পাথরখনি ও কারখানা গড়ে তুলেছিলেন স্থানীয় উদ্যোক্তা রোলান্ড বাসির। সেখানে তাঁর বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ৫০ লাখ ডলার। কিন্তু সশস্ত্র বসতি স্থাপনকারীদের নিয়মিত হামলা, ভাঙচুর এমনকি অগ্নিসংযোগের কারণে তিনি বাধ্য হয়ে ব্যবসা বন্ধ করতে পেরেছেন। শুধু রোলান্ডই নন, স্থানীয় কৃষকদের জমি, জলপাইবাগান এবং পানির কূপগুলোও একে একে দখল করে নিচ্ছে ইসরায়েলিরা। এই পরিস্থিতিতে আত্মরক্ষাই এখন স্থানীয়দের প্রধান চিন্তা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রোলান্ডের স্ত্রী সান্দ্রা বাসির জানান, নিরাপত্তার কথা ভেবে ঘরে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা হয়েছে। রাতে ঘুমানোর আগে দরজা সঠিকভাবে বন্ধ করা হয়েছে কিনা তা বারবার পরীক্ষা করেন তিনি। পাশাপাশি পাহারার জন্য কুকুরও পালন করছেন। এতটুকু নিরাপত্তার মধ্যেও তাঁদের সাত বছরের ছেলেকে বাইরে খেলতে দেওয়া হচ্ছে না। অন্যদিকে শহরের ঐতিহ্যবাহী তাইবেহ ব্রুয়ারির (বিয়ার প্রস্তুতকারক) ব্যবসাও চরম হুমকির সম্মুখীন। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মাদিস খৌরি জানিয়েছেন, বসতি স্থাপনকারীদের দখলে চলে যাওয়ায় তাদের প্রধান পানির উৎস 'আইন সামিয়া' ঝরনা ও ব্যক্তিগত খামার এখন আর ব্যবহার করতে পারছেন না তারা। ফলে আগের তুলনায় আয় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।

ফিলিস্তিনি বেসামরিক প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণাধীন 'এলাকা বি'-তেও বসতি স্থাপনকারীরা নতুন ফাঁড়ি স্থাপন করে জমি দখলের পথ সুগম করছে। এ অবস্থায় গত ৯ আগস্ট ইসরায়েলি সেনাবাহিনী তাইবেহকে 'সামরিক অভিযানের আওতাধীন এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করে। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এই ঘোষণার ফলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে; শহরটি আরও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে এবং বসতি স্থাপনকারীরা নির্বিঘ্নে তাদের তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পুলিশ বা প্রশাসনের কাছে ডাক দিলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে তারা জানান।

নিরাপত্তাহীনতা, ভয় এবং অর্থনৈতিক সংকটের কারণে গত দুই বছরে অন্তত ১৫টি পরিবার শহর ছেড়ে বিদেশে চলে গেছে। স্থগিত হয়ে পড়েছে পর্যটন শিল্পও। তবে প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে রাজি নন অনেক বাসিন্দা। শহরের মেয়র সুলেইমান খৌরিয়াহ বলেন, ধর্মীয় ইতিহাসের সাথে জড়িত এই শহর ত্যাগ করার কোনো প্রশ্নই নেই। যিশুখ্রিষ্টের পদচারণায় পবিত্র হয়ে থাকা এই ভূমি ছেড়ে যাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি আরও বলেন, এখানেই তাদের মৃত্যু হবে এবং এখানেই তাদের সমাহিত করা হবে। উল্লেখ্য, দক্ষিণ লেবাননে বুলডোজার দিয়ে ভেঙে কৃত্রিম দাবানলের মাধ্যমে ইসরায়েল যেভাবে বসতি ও ইতিহাস মুছে দিচ্ছে, সেই একই কৌশল পশ্চিম তীরের এই শহরটির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।