বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) বিসিএস মৌখিক পরীক্ষার প্রচলিত পদ্ধতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। দীর্ঘদিনের প্রথাগত প্রশ্নোত্তরের পরিবর্তে এখন থেকে প্রার্থীর দক্ষতা ও সক্ষমতা যাচাই করতে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘কম্পিটেন্সি-বেজড ইন্টারভিউ’ বা যোগ্যতাভিত্তিক সাক্ষাৎকার পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে। পিএসসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোবাশ্বের মোনেমের মতে, সরকারি ক্যাডার সার্ভিসের জন্য একজন প্রার্থী কতটা উপযুক্ত ও দক্ষ, তা নিরূপণের জন্য বিশ্বজুড়ে এই পদ্ধতিটি অত্যন্ত কার্যকর ও জনপ্রিয়। প্রশাসনিক ও পরীক্ষা পদ্ধতি সংস্কারের অংশ হিসেবে এই পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং কমিশনের সদস্যরা ইতিমধ্যেই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন।
সাধারণত ‘কম্পিটেন্সি’ বলতে প্রার্থীর দক্ষতা, সক্ষমতা এবং বাস্তব ক্ষেত্রে তার প্রয়োগ ক্ষমতাকে বোঝায়। একজন সরকারি কর্মকর্তার জন্য কেবল পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান যথেষ্ট নয়; মাঠ পর্যায়ে মানুষের সাথে যোগাযোগ, সংকটে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ, অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব নিরসন এবং সীমিত সম্পদের সঠিক ব্যবহার করে সেরা ফলাফল আনার সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন। যোগ্যতাভিত্তিক ভাইভায় মূলত এই গুণাবলিগুলোই গভীরভাবে যাচাই করা হয়।
পুরানো ও নতুন পদ্ধতির পার্থক্যের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। আগে প্রশ্ন করা হতো, “আপনি কি মানসিক চাপে কাজ করতে পারেন?” যা একটি সাধারণ দাবি। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে প্রশ্ন হবে, “এমন একটি ঘটনার কথা বলুন, যখন খুব অল্প সময়ে জটিল কোনো কাজ শেষ করতে হয়েছে এবং আপনি পরিস্থিতিটি কীভাবে সামলেছিলেন?” এখানে প্রার্থীকে বাস্তব প্রমাণের মুখোমুখি হতে হয়। একইভাবে নেতৃত্বের গুণাবলি যাচাই করতে এখন আর কেবল “আমি একজন ভালো নেতা” বললেই চলবে না; বরং বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো দলগত কাজে ভিন্নমতের পরিস্থিতি কীভাবে সমাধান করেছিলেন, তার বাস্তব উদাহরণ দিতে হবে। বোর্ড মূলত চারটি বিষয় বিশ্লেষণ করবে: পরিস্থিতি, প্রার্থীর দায়িত্ব, গৃহীত পদক্ষেপ এবং চূড়ান্ত ফলাফল।
যারা সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করেছেন এবং যাদের চাকরির কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা নেই, তাদের জন্য এই পদ্ধতিতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কারণ, ডিবেটিং ক্লাব, নেচার ক্লাব, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বা এমনকি পরিবার ও বন্ধুদের কোনো সংকট সমাধানের অভিজ্ঞতাকেও এখানে কাজের অভিজ্ঞতা হিসেবে গণ্য করা হবে। বোর্ড জানতে চায় প্রার্থীর বাস্তব আচরণ এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেমন ছিল।
বিশ্বজুড়ে সরকারি নিয়োগে এই পদ্ধতির ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার পাবলিক সার্ভিস কমিশন তাদের নিয়োগ নির্দেশিকায় স্পষ্টভাবে এই কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছে। তাদের মূল দর্শন হলো, অতীতে একজন ব্যক্তি কোনো নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কীভাবে আচরণ করেছেন, তা বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতে তার কর্মদক্ষতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব। সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে এটি অত্যন্ত জরুরি, কারণ একজন কর্মকর্তাকে বাস্তব জীবনের জটিল সমস্যার সমাধান করতে হয়।
এই পরিবর্তনের ফলে বিসিএস প্রার্থীদের প্রস্তুতির ধরনেও বদল আনতে হবে। এখন থেকে কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না থেকে নিজেদের অতীত জীবনের চ্যালেঞ্জিং অভিজ্ঞতা, দল পরিচালনা, ভুল সংশোধন এবং সমস্যা সমাধানের ঘটনাগুলো ডায়েরিতে লিখে সাজিয়ে রাখতে হবে। সংক্ষেপে, আগে ভাইভা বোর্ডে জানতে চাওয়া হতো প্রার্থী ‘কী জানেন’, আর এখন জানতে চাওয়া হবে প্রার্থী বাস্তবে ‘কী করেছেন’। এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই হবে আগামীর বিসিএস সাফল্যের মূল চাবিকাঠি।




