নওগাঁ জেলার নিয়ামতপুর উপজেলার গুড়িহারী শালবাড়ি গ্রামের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে বাস করা নুসরাত জাহান এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ অর্জন করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বাঁশঝাড়ে ঘেরা মাটির ঘরে বেড়ে ওঠা নুসরাতের এই সাফল্য কেবল তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং পুরো গ্রাম ও তার বিদ্যালয়ের জন্য এক বড় পাওয়া। স্থানীয় আলোর পাঠশালার প্রধান শিক্ষক যখন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ফলাফল দেখার চেষ্টা করছিলেন, ঠিক তখনই নুসরাতের বাবা নাদের আলী মাস্টারের ফোন কল আসে। নুসরাত আগে থেকেই তাঁর বাবার ফোনে রোল নম্বর দিয়ে এসএমএস করে রেখেছিল, যার ফলে ফলাফল দ্রুত জানা যায় এবং পুরো বিদ্যালয় আনন্দ উল্লাসে মেতে ওঠে।

নুসরাতের এই সাফল্যের পথটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। তাঁর বাবা নাদের আলী মাস্টার একজন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক, যার নিজস্ব কৃষিজমি নেই বললেই চলে। অর্থনৈতিক সংকটের পাশাপাশি তিনি গত সাড়ে তিন বছর ধরে এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। প্রতি মাসে চিকিৎসার জন্য তাঁকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে যেতে হয়। সীমিত বেতন দিয়ে সংসার চালানো, দুই মেয়ের পড়াশোনা এবং চিকিৎসার খরচ মেলাতে নাদের আলী মাস্টার হিমশিম খাচ্ছিলেন। এই অভাবের সংসারে নুসরাতের মা সালমা বেগম হাঁস-মুরগি পালন করে কিছুটা আর্থিক সহায়তা করার চেষ্টা করেন।

শৈশব থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত মেধাবী নুসরাত প্রথম থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম স্থান ধরে রেখেছিলেন। প্রতিকূল পরিবেশ তাকে দমাতে পারেনি; বৃষ্টির দিনে কাদা পথে হেঁটেও তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতেন। রাতে পড়াশোনার সময় তাঁর মা পাশে বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করে তাঁকে সহায়তা করতেন। পড়াশোনার প্রতি এই একাগ্রতা ও কঠোর পরিশ্রমের ফল হিসেবেই তিনি এই অনন্য সাফল্য পেয়েছেন। এমনকি উচ্চ মাধ্যমিকের বই কেনার খরচ জোগাতে এসএসসি পরীক্ষার পর থেকে তিনি প্রাইভেট পড়ানো শুরু করেন, যাতে পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ না পড়ে।

নুসরাতের মা জানান, স্কুল ছুটির পর অন্য সহপাঠীরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকত, নুসরাত তখন বিশ্ব সাহিত্যের বই পড়তেন। নুসরাতের ভবিষ্যৎ লক্ষ্য এখন চিকিৎসক হওয়া। তিনি স্বপ্ন দেখেন নিজের গুড়িহারী গ্রামে একটি ছোট হাসপাতাল গড়ে তোলার, যেখানে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবা পাবেন। প্রতিকূলতাকে জয় করে নুসরাত এখন তাঁর গ্রামের জন্য আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন।