২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ২–১ গোলের জয় তুলে নিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচে পৌঁছেছে আর্জেন্টিনা। ম্যাচের শেষভাগে বদলি হিসেবে মাঠে নামা লাওতারো মার্তিনেজের করা গোলই জয়ের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে আবারও প্রমাণিত হয়েছে যে আর্জেন্টিনা দলটি কঠিন পরিস্থিতিতেও ঘুরে দাঁড়াতে জানে। ফুটবল ইতিহাসে আর্জেন্টিনার পথচলা যেন এক ট্র্যাজেডি ও রূপকথার মেলবন্ধন। ১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ থেকে শুরু করে বর্তমান সময় পর্যন্ত প্রতিটি পরাজয়ের দহন পেরিয়ে তারা বারবার বিজয়ের মরীচিকাকে সত্য করে তুলেছে। সেমিফাইনালে পিছিয়ে পড়ার পরও শেষ পর্যন্ত জিতে নেওয়ার এই মানসিকতা আর্জেন্টিনার ডিএনএ-তে মিশে আছে।

দীর্ঘ ৩৬ বছরের শিরোপা খরা কাটিয়ে ২০২২ সালে কাতারে বিশ্বজয় করার পর এবারও সেই ধারা অব্যাহত রেখেছে দলটি। কোচ লিওনেল স্কালোনি ২০১৮ সালে অন্তর্বর্তীকালীন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে দলটিকে গড়ে তুলেছেন এক অপরাজেয় শক্তিতে। তাঁর রণকৌশল ও দলীয় ঐক্যের কারণে আর্জেন্টিনা বর্তমানে বিশ্ব ফুটবলে এক ভয়ংকর শক্তি হিসেবে পরিচিত। স্কালোনির অধীনে ২০২১ সালে কোপা আমেরিকা, ২০২২ সালে বিশ্বকাপ এবং ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা জিতেছে দলটি।

লিওনেল মেসির নেতৃত্বে এই দলটি যেন এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। মেসির ফুটবল জীবন ছিল ধৈর্য ও কষ্টের এক পরীক্ষা। ২০১৬ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেওয়া মেসি পরে ফিরে এসে দলকে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক সাফল্য। অন্যদিকে আনহেল দি মারিয়া বড় ম্যাচের জাদুকর হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করেছেন। ২০০৮ অলিম্পিক ফাইনাল, ২০২১ কোপা আমেরিকা ফাইনাল এবং ২০২২ বিশ্বকাপ ফাইনালে তার করা গোলগুলো আর্জেন্টিনার ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে।

ইতিহাসের পাতায় আর্জেন্টিনার এই পথচলা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৮৬ সালে মেক্সিকোতে দিয়েগো ম্যারাডোনার 'ঈশ্বরের হাত' গোল থেকে শুরু করে ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারানো—প্রতিটি মুহূর্তই ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে। ২০২২ সালের লুসাইল স্টেডিয়ামের মহাকাব্যিক ফাইনালে ফ্রান্সকে হারিয়ে বিশ্বজয় করে আর্জেন্টিনা, যেখানে প্রথমার্ধে ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও শেষ পর্যন্ত পেনাল্টি শুটআউটে জিতেছিল তারা।

২০২৬ বিশ্বকাপেও সেই একই জেদ ও মনোবল দেখিয়েছে দলটি। সৌদি আরবের কাছে হেরে ২০২২ বিশ্বকাপ শুরু করে শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হওয়া আর্জেন্টিনার জন্য আরেকটি উদাহরণ যে তারা কখনো হাল ছাড়ে না। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে আর্জেন্টিনা শুধু একটি দল নয়, বরং এক আবেগের নাম। নীল-সাদা জার্সির প্রতি ভক্তদের এই ভালোবাসা যেন চিরন্তন। এখন সব দৃষ্টি ফাইনালের দিকে, যেখানে আর্জেন্টিনা আবারও ইতিহাস গড়তে মাঠে নামবে।