বর্তমানে ফুটবল বিশ্বকাপের উত্তেজনা তুঙ্গে। তবে খেলার পাশাপাশি মাঠের ঘাস নিয়েও চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি ও গবেষণা। মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির ‘টার্ফগ্রাস’ বিষয়ের অধ্যাপক জন ট্রে রজার্সের মূল মনোযোগ এখন মাঠের সবুজ আবরণের দিকেই। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডা—এই তিন আয়োজক দেশের ১৬টি স্টেডিয়ামের ঘাসের গুণমান ও টেকসইতা নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। রসিকতার সুরে অধ্যাপক রজার্স জানান, ফুটবলের চেয়েও ঘাসের প্রতি তাঁর আগ্রহ বেশি।
১১ জুন থেকে শুরু হওয়া এই বিশ্ব আসরে মোট ১০৪টি ম্যাচ খেলবে ৪৮টি দল। ছয় সপ্তাহজুড়ে চলা এই প্রতিযোগিতা উত্তর আমেরিকার বিশাল ভৌগোলিক এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকায় আবহাওয়ার মধ্যেও রয়েছে বিস্তর বৈচিত্র্য। কোথাও ভ্যাপসা গরম, তো কোথাও মৃদু আবহাওয়া বিদ্যমান। সাধারণ দর্শকের কাছে ঘাস তেমন গুরুত্বপূর্ণ না মনে হলেও বিশ্বকাপের মতো তীব্র প্রতিযোগিতায় এটি অপরিহার্য। কারণ পিচের ঘাসের ধরনের ওপর নির্ভর করে বলের গতি, খেলোয়াড়দের দৌড়ের ছন্দ এবং চোটের ঝুঁকির মাত্রা।
বিশ্বকাপের ১৬টি ভেন্যুর মধ্যে আটটিতে ছিল কৃত্রিম টার্ফ, বাকি আটটিতে ছিল প্রাকৃতিক ঘাস। কিন্তু ফিফার কঠোর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটি মাঠেই প্রাকৃতিক ঘাস রাখা বাধ্যতামূলক। বিশ্বমানের খেলোয়াড়দের বল নিয়ন্ত্রণ ও স্বাচ্ছন্দ্যের স্বার্থেই এই নিয়ম বলবৎ। এর ফলে সব স্টেডিয়ামের পূর্ববর্তী ঘাস উপড়ে ফেলে আন্তর্জাতিক মানের বিশেষ প্রাকৃতিক ঘাস প্রতিস্থাপন করতে হয়েছে। পাঁচটি স্টেডিয়ামের ওপর ছাদ থাকায় পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়ার সমস্যা পুরো প্রক্রিয়াটিকে আরও দুরূহ করে তুলেছে।
সমগ্র মাঠের অভিন্ন মান রক্ষার লক্ষ্যে ২০২০ সাল থেকে টানা ছয় বছর ধরে ঘাস নিয়ে গবেষণা ও প্রস্তুতির কাজ তদারকি করেছেন অধ্যাপক ট্রে রজার্স ও তাঁর ছাত্র অধ্যাপক জন সোরোচান। আমেরিকার স্টেডিয়ামগুলো মূলত আমেরিকান ফুটবলের উপযোগী করে গড়ে তোলায় এগুলোর আকার আন্তর্জাতিক ফুটবল পিচের তুলনায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ ছোট। যেমন, মিজৌরির কানসাস সিটি স্টেডিয়ামের মাঠ বড় করতে গ্যালারির ১০ সারির আসন পর্যন্ত সরাতে হয়েছে। লস অ্যাঞ্জেলেস, ভ্যাঙ্কুভার প্রভৃতি স্থানের স্টেডিয়ামের কৃত্রিম ঘাস তুলে ফেলে সেখানে সম্পূর্ণ নতুন প্রাকৃতিক ঘাস বসানো হয়েছে।
গবেষকেরা মূলত তিন প্রজাতির ঘাস নির্বাচন করেছেন। প্রতিটি স্টেডিয়ামের স্থানীয় আবহাওয়ার সাথে মানানসই ঘাস বাছাইয়ে বিশেষ যন্ত্রের সাহায্য নেওয়া হয়, যা খেলোয়াড়দের বুটের ঘর্ষণে ঘাসের স্থায়িত্ব ও বল ড্রপের পর তার লাফিয়ে ওঠার উচ্চতা পরিমাপ করতে পারে। টরন্টো, ফিলাডেলফিয়া ও মেক্সিকো সিটির মতো অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা অঞ্চলের জন্য কেন্টাকি ব্লুগ্রাস ও পেরেনিয়াল রাইগ্রাস ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে মায়ামি, গুয়াদালাহারা ও মন্টেরের মতো উষ্ণ এলাকার স্টেডিয়ামে দেওয়া হয়েছে বারমুডা ঘাস।
ছাদঢাকা স্টেডিয়ামগুলো এই নির্বাচনের সমীকরণকে জটিল করে তুলেছে। হিউস্টন, ডালাস ও আটলান্টার বাইরের তাপমাত্রা গরম থাকায় বারমুডা ঘাসই যুক্তিযুক্ত ছিল, কিন্তু ছাদের নিচে সার্বক্ষণিক কম আলো ও এসির ঠান্ডা পরিবেশের কারণে শেষ পর্যন্ত সেসব মাঠে ঠান্ডা সহনশীল ঘাস রোপণের সিদ্ধান্ত নিতে হয়। ইনডোর ভেন্যুগুলোর ঘাস সতেজ রাখতে বিশেষ সেচব্যবস্থা ও চাকাযুক্ত কৃত্রিম গ্রো লাইট মোতায়েন করা হয়েছে। প্রতিদিন নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এসব আলো ব্যবহার করে ঘাসকে তাজা রাখা হচ্ছে। এর আগে বিশ্বের আর কোথাও একই আসরে এতগুলো ইনডোর স্টেডিয়ামে দীর্ঘ সময় ধরে বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের নজির নেই।
স্টেডিয়ামগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা কৃত্রিমভাবে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে স্থির রাখা হবে। সেই বিশেষ ঘাস কলোরাডোর শীতল পরিবেশে চাষ করেছেন জো উইলকিন্স। স্থানীয়ভাবে এই ঘাস জন্মানো অসম্ভব হওয়ায় প্লাস্টিক, নুড়ি ও বালুর স্তরের ওপর কার্পেটের মতো করে চাষ সম্পন্ন করা হয়। ব্যাকআপসহ প্রায় ৯ একর জমির ঘাস গত ২৫ মে ২৪টি হিমায়িত ট্রাকে করে ১ হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে হিউস্টনের স্টেডিয়ামে পৌঁছায়। মাঠকে আরও মজবুত করতে ঘাসের ভেতর প্লাস্টিকের কৃত্রিম ফাইবার সেলাই করে দেওয়া হয়েছে। ৩৪ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন অধ্যাপক রজার্স মাঠের মান নিয়ে আত্মবিশ্বাসী। ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপে তিনিই প্রথম ইনডোর স্টেডিয়ামে প্রাকৃতিক ঘাসের পিচ তৈরির মডিউলার পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিলেন, যা এবারও প্রয়োগ করা হয়েছে।



