যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা ক্লারা লিন্ডেনের গবেষণার বিষয় প্রসব। তৃতীয় বিশ্বের গ্রামীণ নারীদের প্রসবসংক্রান্ত ভাবনা, বিশ্বাস ও চর্চা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে তিনি পৌঁছেছেন নিজকলমোহনা গ্রামে। ঢেঁকিঘরে পিঁড়ির ওপর বসে আছেন তিনি, সাথে আছেন অনুবাদক মাহজাবিন খান এবং গ্রামের প্রবীণ ধাত্রী কাশমতি বেওয়া। সেখানে তিনজনের আলাপের কেন্দ্রে রয়েছে আব্বাসের জন্মবৃত্তান্ত।
কিছুক্ষণ আগে আব্বাস এসে তাদের গ্লুকোজ বিস্কুট দিয়ে গেছে। কাশমতি বেওয়াই তাকে মুদির দোকানে পাঠিয়েছিলেন। ঢেঁকিঘরটি আসলে একটা ছনের ছাউনিমাত্র, যার নিচে নুয়ে থাকা ক্লান্ত ঢেঁকি। চারদিক দিয়ে হাওয়া বইছে। কিছুটা দূরত্বে জামগাছতলায় দাঁড়িয়ে আব্বাস তার বন্ধুকে বলছে, ভিসিআরে দেখেছে ক্লারার মতো বিদেশি মেয়েরা উলঙ্গ হয়ে নানাবিধ কুকর্ম করে থাকে। শ্বেতাঙ্গ সম্পর্কে তার এই ধারণা সম্প্রতি হাটে দেখা নীল ছবি থেকে। নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে দুই বন্ধু আড়চোখে ক্লারাকে দেখছে।
ক্লারার হাতে কলম-নোটবই, মাহজাবিনের হাতে মাইক্রোক্যাসেট, কাশমতির হাতে একটা ঝরা বাঁশপাতা। গণনামন্ত্রটির অনুবাদ শোনার জন্য আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন ক্লারা। কিন্তু মন্ত্র অনুবাদ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন মাহজাবিন। ইংরেজি সাহিত্যের তুখোড় ছাত্রী হলেও গর্ভগণনার মন্ত্রের ইংরেজি অনুবাদ তার জন্য অভূতপূর্ব ব্যাপার। নাগরিক মাহজাবিন ঢেঁকিঘরের মতো গ্রামীণ পরিবেশে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছিলেন না। পত্রিকায় ক্লারার খবর দেখে নিছক কৌতূহলে তিনি এই কাজে যোগ দিয়েছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি ইংরেজিতে বলেন, ‘শোনো ক্লারা, মন্ত্রটা তো ক্যাসেটে রইল, আমি না হয় সময় নিয়ে ভেবেচিন্তে পরে তোমাকে তরজমা করে দেব।’ তাত্ক্ষণিকভাবে মন্ত্রের রস আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হওয়ায় ক্লারা কিছুটা মনঃক্ষুণ্ন হন।
গতকাল নিজকলমোহনা বিলে বাউথ হয়েছে। যৌথ মাছশিকার উৎসবে সবচেয়ে বেশি মাছ উঠেছে আব্বাসের জালে। সেই আব্বাসের জন্মবৃত্তান্তের কথাই চলছিল। কাশমতিকে জিজ্ঞাসা করা হয়, এ পর্যন্ত কতগুলো প্রসব তিনি করিয়েছেন। তিনি কিছুটা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন, কারণ তিনি শুধু মানুষের নয়, গাভি ও ছাগিরও দক্ষ ধাত্রী। মাহজাবিনের মাধ্যমে ক্লারা জানান, তিনি শুধু মানবশিশুর প্রসবের কথা জানতে চান। তাতে কাশমতি আশ্বস্ত হন। তিনি বলেন, ‘ম্যালা করছি। এক হজ তো পার করছি সেই কবে, আরেক হজ হয় হয়।’ হজের ব্যাপারটি কারও কাছে স্পষ্ট হয় না। ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কাশমতি তাদের বিস্কুট খেতে বলেন এবং টিউবওয়েল থেকে পানি এনে দেন। এরপর তিনি ঘর থেকে লম্বা একটি দড়ি নিয়ে আসেন, যাতে অসংখ্য গিঁট দেওয়া। তিনি জানান, প্রতিটি গিঁট একটি করে প্রসবের হিসাব। ‘লেখাপড়া নাই তো, এটাই হইল আমার হিসাবের খাতা।’ তিনি বলেন, ১০১টি বাচ্চা প্রসব করাতে পারলে এক হজের সওয়াব হয়। তার দড়িতে গিঁট আছে ১৮২টি।
আব্বাসের জন্মবৃত্তান্তটি কাশমতির কাছে স্মরণীয়, কারণ তা ছিল নাটকীয়। আব্বাসের মায়ের আগে চারটি কন্যাসন্তান হয়েছে। এবার পুত্রসন্তান না হলে সংসারে গভীর বিপর্যয় নেমে আসবে, অনিবার্য তালাক হয়ে যাবে। তাই আব্বাসের মা দিনরাত কাঁদে। কাশমতি গণনা করে বলেছিলেন এবার ছেলেই হবে, তবু ভয় যায়নি তার। তাই সাত মাসের গর্ভকালীন সাত মাইস্যা গীত গাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। কয়েকজন মহিলা মিলে ছেলে হওয়ার সেই গান গায়। ক্লারা গানটি শোনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। প্রথমে কাশমতি লজ্জিত হলেও শেষ পর্যন্ত আম্বিয়াকে ডেকে আনেন, যার গলায় সুর আছে। তারা ঢেঁকিঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একে অন্যের কাঁধে হাত রেখে তালে তালে গান গায়— ‘চাম্পা হয়েছে মা গো সাত মাসের গর্ভ, বল হায় হায় গো... কোথায় পাব এখন বাবার দেশের দাইয়ানি, বল হায় হায় গো।’ গান শেষে তারা হেসে ওঠে, ক্লারা হাততালি দেন। গানটির সারল্যে মুগ্ধ হন ক্লারা। বিশেষ করে ‘আমারে আইনা দাও মা বাবার দেশের দাইয়ানি’ পঙ্ক্তিটি তার কাছে চমত্কার মনে হয়। তিনি মাহজাবিনের সঙ্গে আলাপ করে বলেন, প্রসববেদনার মুহূর্তে মেয়েটির মনে পড়ছে বাবার বাড়ির ধাত্রীর কথা। স্বামীর বাড়ির অনাত্মীয় পরিবেশে সে প্রত্যাশা করছে বাবার বাড়ির মমতার স্পর্শ। এখানে ফুটে উঠেছে পিতৃতান্ত্রিক সমাজের একজন নারীর গোপন বেদনা।
এমন সময় একজন কাঁচাপাকা দাড়ি, তেলচকচকে চুল, পায়জামা-পাঞ্জাবি পরা মানুষ উঠান পেরিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসেন। তিনি বলেন, ‘স্লামালেকুম, মেরা নাম হ্যায় আব্দুল কুদ্দুস। ম্যায় ইস ইউনিয়ন কা মেম্বার হু।’ তিনি ভেবেছিলেন, বিদেশিদের সঙ্গে উর্দুতেই কথা বলা উচিত। কিন্তু মাহজাবিন বাংলায় কথা বললে তিনি কিছুটা হতাশ হন। নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে কী ঘটছে তা জানার দায়িত্ববোধ থেকে তিনি এসেছেন। কাশমতি হেসে বলেন, ‘পোলাপাইন কেমনে খালাস করি, এইগুলান জানতে চায়।’ এতে আব্দুল কুদ্দুস নির্ভার হন। ক্লারাকে দেখিয়ে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, ‘উনি কোন দ্যাশের মানুষ?’ মাহজাবিন জানালে তিনি বিগলিত হাসিতে ক্লারাকে আপাদমস্তক দেখেন এবং চলে যান।
কাশমতি আবার আব্বাসের জন্মের বর্ণনায় ফিরে যান। আব্বাসের মায়ের প্রসবব্যথা ওঠে বিকেলের দিকে। কাশমতি শাস্ত্রবিচার করে বলেন, বাচ্চা হবে মাঝরাতে। শাস্ত্রমতে, মায়ের একগোছা চুল মুখের ওপর নাক বরাবর ঝুলিয়ে দিয়ে তার ওপর কয়েক ফোঁটা তেল ঢালা হয়। তেল চুল বেয়ে গড়িয়ে পড়বে স্ফীত পেটে। তেল নাভি বরাবর পড়লে বাচ্চা হবে যখন-তখন, বাঁ পাশে পড়লে ঘণ্টাখানেক পরে, আর ডানে পড়লে অনেক দেরি। আব্বাসের মায়ের তেল পড়েছিল ডান দিকে। সন্ধ্যার পর থেকে কাশমতি প্রস্তুতি নিতে থাকে। তিনি পোয়াতির ঘরে ছেঁড়া জাল আর পুরোনো লোহা রেখে দেন, যা খারাপ বাতাস ও জিনের হাত থেকে রক্ষা করবে। শেষরাতে পানি ভাঙে। জরায়ুপথে বাচ্চার মাথা বের হওয়ার পর দেখা যায়, গলায় নাড়ি জড়িয়ে আছে। কাশমতি অনেক কসরত করে নাড়ির প্যাঁচ ছাড়ান। ছেলে হওয়ায় সবার মুখে হাসি ফুটলেও বাচ্চা কাঁদে না। তাছাড়া গর্ভফুলও বেরিয়ে আসছে না। কাশমতি দ্রুত দুটি ব্যবস্থা নেন। তিনি আব্বাসের বাবাকে লুঙ্গি উল্টিয়ে পরতে বলেন, শাস্ত্রমতে এতে গর্ভফুল দ্রুত বেরিয়ে আসে। আরেকজনকে কাঁসার থালা সজোরে বাচ্চার কানের কাছে বাজাতে বলেন। কিছুক্ষণের মধ্যে গর্ভফুল বেরিয়ে আসে, কিন্তু বাচ্চা তবু কাঁদে না। তখন কাশমতি একটি কড়াই গরম করে তাতে সদ্য বেরিয়ে আসা রক্তে জবুথবু গর্ভফুল ভাজতে শুরু করেন। গর্ভফুলের অপর প্রান্তে নাড়ির সঙ্গে যুক্ত শিশুটি। কড়াইয়ে ফুল ভাজতে ভাজতেই এক পর্যায়ে নড়ে ওঠে শিশুটি এবং তীব্র শব্দে কেঁদে ওঠে। সবার স্বস্তির নিশ্বাস পড়ে। এরপর কাশমতি গরম পানিতে ধুয়ে নেওয়া মাছ কাটা বঁটি দিয়ে আব্বাসের নাড়ি কাটেন। তাই সব বাউথে সবচেয়ে বেশি মাছ ওঠে আব্বাসের জালে।
কাশমতির বিবরণের অনুবাদ শুনতে শুনতে ক্লারা ভাবেন, তার থিসিসটি দুর্দান্ত হবে। ‘দারুণ এক্সোটিক সব ডেটা পাওয়া যাচ্ছে।’ অন্যদিকে মাহজাবিনের মনে অস্বস্তি ও বিস্ময় কাজ করে। এসব অদ্ভুত কাণ্ড দেখে তার মনে হয়, নিজের দেশের ভেতর এ কোন অচেনা সুদূর দেশ? কাকে অনুবাদ করবে সে? তার নিজেরই তো এখন প্রয়োজন একজন দোভাষীর। ঢেঁকিঘরে তখন দুপুর, তিন নারীর মিথস্ক্রিয়া চলছে।




