অনেকের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় সকাল, দুপুর ও রাতে প্রায় একই ধরনের খাবার দেখা যায়। অভ্যাস বা সুবিধার কারণে এই একঘেয়ে খাদ্যাভ্যাস (ফুড মনোটনি) অনেকের কাছেই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে প্রশ্ন হলো, এই অভ্যাস কি শরীরের জন্য আদৌ ভালো, নাকি অজান্তেই ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে?

চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই অভ্যাসকে বলা হয় একঘেয়েমি খাদ্যাভ্যাস। দৈনন্দিন কাজ সহজ করতে, সিদ্ধান্তহীনতা এড়াতে এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই অভ্যাস কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পুষ্টিবিদদের মতে, নিয়মিত একই খাবার খাওয়ার সুবিধার পাশাপাশি কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকিও রয়েছে।

একই খাবার প্রতিদিন খাওয়ার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় এবং মানসিক চাপ বাঁচানো। কী রান্না হবে বা বাজার থেকে কী কেনা হবে—এই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, যদি খাবারে প্রক্রিয়াজাত পদার্থ, অতিরিক্ত চর্বি, লবণ বা চিনির পরিমাণ বেশি থাকে, তাহলে শরীরে দ্রুত পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ম্যারিয়ন নেস্টলের মতে, দৈনিক খাবার যদি সুষম এবং স্বাস্থ্যকর হয়, তাহলে বারবার একই খাবার খাওয়ায় কোনো ক্ষতি নেই। ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের ডায়েটিশিয়ান জুলিয়া জুম্পানোও একই মত পোষণ করেন। তাঁর ভাষ্য, খাবারে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট ও স্বাস্থ্যকর চর্বির সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

কেন মানুষ প্রতিদিন একই খাবার খেতে পছন্দ করে, তার বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। পুষ্টিবিদ ডেল নেস্টলের মতে, মানুষ যেসব খাবার পছন্দ করে, সেগুলোই বারবার খেতে চায়। অনেকেই আবার ওজন কমানোর উদ্দেশ্যে এই অভ্যাস গড়ে তোলে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত একই খাবার খান, তারা তুলনামূলকভাবে দ্রুত ওজন কমাতে সক্ষম হন। কারণ, প্রতিবেলা ক্যালোরি গণনা করার ঝামেলা এড়ানো যায় এবং বুফেতে যেমন অনেক পদের খাবার দেখে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা থাকে, এখানে সেই সুযোগও থাকে না।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানসিক চাপ থেকেও অনেকে এই পথ বেছে নেন। দৈনন্দিন খাবারের মেনু ঠিক করা এবং বাজার করা ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। তবে পুষ্টির ভারসাম্য বজায় রাখতে খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। একদিন সকালে একটি খাবার খেলে পরের দিন অন্য খাবার খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা। একইভাবে, একদিন মাংস খেলে পরের দিন মাছ বা সবজি খাওয়া যেতে পারে। ফলমূলের ক্ষেত্রেও বৈচিত্র্য আনা জরুরি—আজ পেয়ারা খেলে কাল আনারস, ড্রাগন বা তরমুজ খাওয়া ভালো।

তবে কোনো নির্দিষ্ট খাবার অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়া ঠিক নয়। এতে ক্ষতিকর উপাদান বা অতিরিক্ত লবণের মতো ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার বৈচিত্র্যের নামে অস্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ নয়। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, স্বাস্থ্যের জন্য বৈচিত্র্যের চেয়ে সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার নির্বাচন করাই সবচেয়ে জরুরি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিন তিন বেলা হুবহু একই খাবার খাওয়া উচিত নয়। ডায়েটিশিয়ান জুলিয়া জুম্পানো জানান, দিনে অন্তত এক বা দুই বেলা ভিন্ন খাবার খাওয়া নিশ্চিত করলে শরীরে ভিটামিন ও পুষ্টির ঘাটতি দেখা দেয় না। আমাদের পরিপাকতন্ত্রের উপকারী জীবাণু (মাইক্রোবায়োম) বৈচিত্র্যময় খাবার পছন্দ করে।

২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ সবচেয়ে বেশি সকালের নাশতায় একই খাবার বারবার খেয়ে থাকে। গবেষণার অন্যতম লেখক অধ্যাপক কেরি মোরওয়েজ জানান, সকালে কাজ বা স্কুলে যাওয়ার তাড়া থাকায় মানুষ দ্রুত ও সহজলভ্য নাশতা বেছে নেয়। তাঁর মতে, সকালের নাশতা মূলত দিনের বাকি কাজ শুরু করার একটি উপায়। অন্যদিকে, দুপুরের এবং রাতের খাবার মানুষ একটু সময় নিয়ে, বৈচিত্র্যময় পদের স্বাদ উপভোগ করে এবং অন্যের সঙ্গে কথোপকথনে মেতে থেকে খায়।