গত কয়েক বছরে স্বাস্থ্য ও ওজন নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় বারবার উঠে এসেছে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে খাবার গ্রহণ, সপ্তাহে কিছুদিন ক্যালরি কমানো কিংবা দীর্ঘক্ষণ উপবাসে থাকার মতো পদ্ধতিগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক প্রচার পাচ্ছে। অনেকেই নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে জানিয়েছেন, এই খাদ্যাভ্যাসে ওজন কমেছে এবং শরীর হালকা বোধ হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে গবেষকরা স্পষ্ট করেছেন, এটি কোনো অলৌকিক সমাধান নয়। একজনের জন্য কার্যকর হলেও অন্যজনের ক্ষেত্রে একই ফল পাওয়া নাও যেতে পারে। কার্যকারিতা অনেকটাই নির্ভর করে ব্যক্তির শরীর, জীবনযাপন এবং ফাস্টিংয়ের ধরনটির ওপর।
দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে শরীরের শক্তি ব্যবহারের কৌশলে পরিবর্তন ঘটে। প্রথমে সহজলভ্য গ্লুকোজ ব্যবহার হয়; পরবর্তী পর্যায়ে চর্বির সঞ্চিত ভাণ্ডার থেকে শক্তি নেওয়ার প্রবণতা বাড়ে। গবেষণায় এই পরিবর্তনকে ‘মেটাবলিক সুইচ’ বলা হয়ে থাকে। ফাস্টিংয়ের সঙ্গে প্রায়ই অটোফ্যাজির প্রসঙ্গও উঠে আসে—এটি কোষের ক্ষতিগ্রস্ত উপাদান পুনর্ব্যবহারের একটি প্রক্রিয়া। যদিও ধারণা করা হয়, এটি কোষের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখতে পারে, তবে এ-সংক্রান্ত অধিকাংশ তথ্য ইঁদুরের ওপর পরিচালিত গবেষণা থেকে পাওয়া। মানুষের শরীরে একই মাত্রায় ও একইভাবে এই প্রক্রিয়া কাজ করবে, এমন নিশ্চয়তা এখনো পাওয়া যায়নি।
ওজন হ্রাসের সম্ভাবনাই ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের সবচেয়ে জনপ্রিয় কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করলে মানুষের ওজন কমতে পারে। কিন্তু প্রচলিত ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ বা অন্যান্য খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় এই ফলাফল নাটকীয়ভাবে বেশি নয়। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খেলেই ওজন কমবে—এমন ধারণা ভুল। যদি সেই সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত ক্যালরিযুক্ত খাবার, মিষ্টি পানীয় বা প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করা হয়, তাহলে দীর্ঘক্ষণ উপবাসের সুবিধা অনেকাংশে হ্রাস পায়। কিছু গবেষণায় ওজন কমার পাশাপাশি রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলসহ কিছু বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকে উন্নতির ইঙ্গিত মিলেছে; যদিও সেই উপকারের মাত্রা ব্যক্তি, শারীরিক অবস্থা ও ফাস্টিংয়ের ধরনের ওপর নির্ভরশীল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাস্টিংয়ের সাফল্যের গল্প সহজেই চোখে পড়ে। কেউ কয়েক সপ্তাহে ওজন কমানোর ছবি পোস্ট করছেন, আবার কেউ দীর্ঘ সময় না খেয়েও স্বাচ্ছন্দ্য বোধের কথা বলছেন। কিন্তু একজনের অভিজ্ঞতা সবার শরীরে একইভাবে প্রযোজ্য হবে, এটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। বয়স, ঘুমের গুণগত মান, দৈনন্দিন শারীরিক পরিশ্রম, মানসিক চাপ, খাবারের ধরন, হরমোন ও সামগ্রিক স্বাস্থ্য—সবকিছুই ফলাফলে প্রভাব ফেলে। কারও কাছে ১৬ ঘণ্টা উপবাস সহজ হতে পারে, অন্যদিকে কারও ক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় না খেলে মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, অতিরিক্ত ক্ষুধা কিংবা পরবর্তীতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তাই অন্যের রুটিন হুবহু অনুসরণ করাই সঠিক পথ নয়।
গবেষণার একটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো, মানুষ নিজের খাদ্যগ্রহণের হিসাব কতটা নির্ভুলভাবে রাখতে পারছেন। সকালের নাশতা, দুপুরের ও রাতের খাবার মনে থাকলেও মাঝখানের ছোট ছোট নাশতা—একটি বিস্কুট, এক মুঠো বাদাম, এক কাপ মিষ্টি চা—হিসাবের বাইরে থেকে যেতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের দেওয়া খাদ্যতথ্যে প্রতিদিনের কয়েক শ ক্যালরি পর্যন্ত কম উল্লেখ করার প্রবণতা রয়েছে। দৈনন্দিন জীবনেও বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় মনে হয়, ‘আমি তো খুব কম খাই, তবু ওজন কমছে না কেন?’ অথচ পুরো দিন ধরে কী খাওয়া হচ্ছে, কতবার ও কতটা গ্রহণ করা হচ্ছে—তার সঠিক হিসাব রাখা সবসময় সহজ নয়।
শুধু উপবাসের সময় নয়, খাবারের মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কখন খাচ্ছেন, তার পাশাপাশি কী ও কতটা খাচ্ছেন—সেটিও বিবেচ্য। পর্যাপ্ত প্রোটিন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া, নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা ও পর্যাপ্ত ঘুম—এসবও সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিশেষ করে অত্যন্ত কঠোর ফাস্টিং বা একদিন পরপর খাবার গ্রহণের মতো পদ্ধতিতে শুধু চর্বিই নয়, পেশির পরিমাণও হ্রাস পাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। তাই ওজন কমানোর ক্ষেত্রে শুধু দাঁড়িপাল্লার সংখ্যা কমছে কি না, সেটিই একমাত্র মাপকাঠি হওয়া উচিত নয়। পেশি ধরে রাখা, শক্তি বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যকর অভ্যাস টিকিয়ে রাখাও সমান জরুরি।
গবেষকেরা এখন মানুষের প্রকৃত খাদ্যাভ্যাস আরও নির্ভুলভাবে বোঝার জন্য নতুন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন। খাবারের ছবি বিশ্লেষণ, চিবানোর ধরন শনাক্ত করতে সক্ষম যন্ত্র, স্মার্ট ফর্ক কিংবা দাঁতে লাগানো ক্ষুদ্র সেন্সর—এসব নিয়ে গবেষণা চলছে। পাশাপাশি রক্ত ও প্রস্রাবের বিভিন্ন উপাদান বিশ্লেষণ করে একজন মানুষের খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য ধারণা পাওয়ার চেষ্টাও অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে এসব প্রযুক্তি মানুষের নিজের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি শরীর বাস্তবে কী পেয়েছে, সে সম্পর্কে আরও স্পষ্ট চিত্র দিতে সক্ষম হতে পারে।
তাহলে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কি আপনার জন্য উপযুক্ত? এর কোনো একক উত্তর নেই। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার অভ্যাস যদি আপনার জীবনযাপনের সঙ্গে সহজে মানিয়ে যায়, অপ্রয়োজনীয় নাশতা কমাতে সাহায্য করে এবং স্বাস্থ্যকর খাবার বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে এটি কার্যকর হতে পারে। কিন্তু এটিকে অলৌকিক পদ্ধতি ভাবার কোনো কারণ নেই। দীর্ঘ সময় না খাওয়ার পর যদি অতিরিক্ত খাওয়া হয়, দিনের বাকি সময় পুষ্টিহীন খাবার গ্রহণ করা হয়, পর্যাপ্ত ঘুম না হয় কিংবা শারীরিক সক্রিয়তা একেবারেই না থাকে, তাহলে শুধু ‘ফাস্টিং’ করলেই সুস্থতা নিশ্চিত হবে না। শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এমন একটি অভ্যাস বেছে নেওয়া, যা আপনার শরীর, দৈনন্দিন কাজের সময়সূচি ও জীবনযাপনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং দীর্ঘদিন ধরে বজায় রাখা সম্ভব। সুস্থ থাকার রহস্য হয়তো কোনো নতুন ফিটনেস ট্রেন্ডের মধ্যে লুকিয়ে নেই। বরং নিজের শরীরের প্রয়োজন বোঝা, কী খাচ্ছেন সে বিষয়ে সচেতন থাকা, নিয়মিত নড়াচড়া করা, পর্যাপ্ত ঘুমানো এবং বছরের পর বছর ধরে জীবনের অংশ হয়ে থাকতে পারে—এমন অভ্যাস গড়ে তোলাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।




