২০১৯ সালে মাত্র এক লাখ টাকা পুঁজি নিয়ে যাত্রা শুরু করা চামড়াজাত পণ্যের দেশীয় ব্র্যান্ড ‘ওয়াইল্ড ওভেন’ এখন নিজস্ব আউটলেট খুলেছে রাজধানীর বনানীতে। এর আগে শুধুমাত্র অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রি হতো প্রতিষ্ঠানটির পণ্য। সেই সঙ্গে দেশের বাইরে জাপানের বাজারেও পা রাখতে যাচ্ছে তারা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে ২০১৪ সালে স্নাতক সম্পন্ন করা ফয়সাল ইসলাম এবং ২০১৩ সালে লেদার প্রোডাক্টস ইঞ্জিনিয়ারিং থেকে স্নাতক হওয়া এনামুল হক — এই দুই বন্ধুর আক্ষেপ থেকেই ব্র্যান্ডটির জন্ম। ফয়সাল ইসলাম বলেন, বিশ্বের যেকোনো দেশে গেলে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ট্যাগ লাগানো পণ্য পাওয়া যায়, কিন্তু একটি স্বতন্ত্র ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ড খুঁজে পাওয়া যায় না। সেই শূন্যতা পূরণের চেষ্টাই তাদের উদ্যোগের প্রেরণা।

প্রতিষ্ঠানটির প্রথম পণ্য ছিল ওয়ালেট। দেশি ক্রেতাদের কথা মাথায় রেখেই এর নকশা তৈরি করা হয়। ফয়সাল জানান, বাজারে প্রচলিত ওয়ালেটগুলো দেশীয় মানুষের ব্যবহারের কথা বিবেচনা করে বানানো হয়নি। তাই টাকার আকৃতির সঙ্গে মানানসই করে ওয়ালেটের নকশায় পরিবর্তন আনা হয়, পয়সা ও কার্ড রাখার অতিরিক্ত খাঁজ কমানো হয়। ফলে ওয়ালেটটি হয়ে ওঠে হালকা। এই ওয়ালেট ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।

লম্বা সময় ধরে পেছনের পকেটে ভারী ওয়ালেট রাখার ফলে অনেকের কোমরে ব্যথা হতে পারে — এই বিষয়টি বিবেচনা করে তাঁরা সামনের পকেটের জন্য উপযোগী আরেকটি ওয়ালেটের নকশা করেন, যা ক্রেতাদের কাছেও সমাদৃত হয়। বর্তমানে প্রযুক্তিনির্ভর ওয়ালেট নিয়ে কাজ করছেন তাঁরা। নিরাপত্তার জন্য স্ক্যান–প্রতিরোধী ওয়ালেট বাজারে এনেছে প্রতিষ্ঠানটি। এতে অ্যাপলের ‘এয়ার ট্যাগ’ রাখারও ব্যবস্থা রয়েছে, ফলে ওয়ালেট হারিয়ে গেলে সঙ্গে সঙ্গে মালিক বার্তা পাবেন।

শুধু ওয়ালেটই নয়, ওয়াইল্ড ওভেনের সংগ্রহে রয়েছে কার্ড হোল্ডার, পাসপোর্ট হোল্ডার, বেল্ট, ল্যাপটপ স্লিভ, রোদচশমার কেস, কলম ও ঘড়ির কেস, চাবির রিং এবং প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখার ব্যাগ। ছয়টি ভিন্ন রঙে পাওয়া যাবে এসব পণ্য। শিগগিরই চামড়ার জ্যাকেটও বাজারে আনবে প্রতিষ্ঠানটি।

ব্যবসার শুরু থেকেই পণ্যের মানের সঙ্গে কোনো আপস করেননি দুই উদ্যোক্তা। পরিবেশ রক্ষার বিষয়টিও তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেন। ফয়সাল ইসলামের মতে, পৃথিবী সুস্থ থাকলে তবেই মানুষ সুস্থ থাকবে। তাই চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ থেকে পূর্ণাঙ্গ পণ্য তৈরির প্রতিটি ধাপে পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়। এছাড়া পণ্য তৈরির পর বেঁচে যাওয়া অব্যবহৃত চামড়ার অভিনব ব্যবহারও শুরু করেছে ওয়াইল্ড ওভেন। তারা বিনা মূল্যে ওয়ার্কশপ পরিচালনা করে, যেখানে প্রশিক্ষণ শেষে প্রশিক্ষণার্থীদের সেই অব্যবহৃত চামড়া দেওয়া হয় — যা তারা অনুশীলন ও নতুন পণ্য তৈরিতে ব্যবহার করতে পারেন।

শিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগরদের কল্যাণেও নজর দিয়েছেন তাঁরা। ফয়সালের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, চামড়াজাত পণ্যের কারিগরদের একটি বড় অংশ অপুষ্টির শিকার। তাদের কারখানায় বর্তমানে ৭০ জন কারিগর কাজ করেন। বেতনের বাইরে এসব কারিগরকে পুষ্টিকর খাবার এবং দক্ষতা উন্নয়নে ইংরেজি শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

ওয়াইল্ড ওভেনের একটি জনপ্রিয় ওয়ালেটের নাম ‘হাইকু’। ফয়সাল জানান, হাইকু কবিতায় যেমন তিন লাইনে ১৭টি অক্ষর থাকে, তেমনি এই ওয়ালেটটিও তিনটি অংশে বিভক্ত এবং ১৭টি উপাদানে তৈরি। বনানীর আউটলেটটির নকশাও ভিন্ন ধাঁচের। দোকানের ভেতরের একাংশে চলচ্চিত্রের দৃশ্য প্রদর্শিত হয় — কখনো আব্বাস কিয়ারোস্তামির ‘২৪ ফ্রেম’, কখনোবা তারেক মাসুদের ‘আদম সুরত’। হালকা শব্দে এসব দৃশ্য মানসিক প্রশান্তি দেয়। দোকানের একপাশে বসার জায়গা রাখা হয়েছে, যেখানে কোনো পণ্য প্রদর্শন করা হয় না। ফয়সাল ইসলাম বলেন, তারা মানুষকে শুধু ক্রেতা হিসেবে দেখতে চান না; চান তাঁদের সঙ্গে কথা হোক। এই স্থানটি মূলত কথা বলার জায়গা হিসেবে তৈরি করা হয়েছে।