অ্যানিমে, কমিকস বা চলচ্চিত্রের চরিত্রে সাজাকে সাধারণত কসপ্লে হিসেবে মনে করা হয়। তবে সম্প্রতি ইনডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের (আইইউবি) এক আয়োজন সেই প্রচলিত ধারণাকেই ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা সেখানে বাঙালির পোশাক, খাবার, সাহিত্য ও ঐতিহ্যকে নতুন করে আবিষ্কার করেছে নিজেদের শিকড়ের সন্ধানে।
আর্ট অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স ও ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের সমন্বয়ে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের সূচনা হয় চিত্রপ্রদর্শনী উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে। শিল্পী ও বাংলাদেশ জাতীয় কারুশিল্প পরিষদের সভাপতি চন্দ্র শেখর সাহা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে ফিতা কেটে এই প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন এবং শিক্ষার্থীদের আঁকা ছবি দেখে প্রশংসা করেন। অনুষ্ঠানে আইইউবির ডিপার্টমেন্ট অব সোশ্যাল সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যানিটিজের অধ্যাপক ড. কাজী মাহমুদুর রহমান, আর্ট অ্যান্ড অ্যাসথেটিক্স কোর্সের শিক্ষক অধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্তী এবং ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের শিক্ষক অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নুসহ দুই কোর্সের শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
শ্রেণিকক্ষের বাইরে গিয়ে পাঠ্যক্রমকে বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত করাই ছিল এ আয়োজনের অন্যতম লক্ষ্য। স্বাগত বক্তব্যে ড. কাজী মাহমুদুর রহমান কারিকুলাম ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রামের ধারণা তুলে ধরেন এবং শিল্প ও সংস্কৃতিকে শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ না রাখার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। অধ্যাপক সঞ্জয় চক্রবর্তী বলেন, শিল্পকে বোঝা, অনুভব করা এবং প্রাণবন্তভাবে উপস্থাপনের একটি বাস্তব উদাহরণ হলো এই আয়োজন। অন্যদিকে অধ্যাপক মাসউদ ইমরান মান্নু তাঁর বক্তব্যে ভৌগলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের আন্তর্জাতিক গুরুত্বের কথা বলেন এবং পোশাক, খাবার ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ঐতিহ্য বহনের বিষয়টি তুলে ধরেন।
আয়োজনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ ছিল ন্যাশনাল কালচার অ্যান্ড হেরিটেজ কোর্সের শিক্ষার্থীদের হেরিটেজ কসপ্লে। এখানে শিক্ষার্থীরা নিজের পরিবার, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে চরিত্র ও পোশাক বেছে নিয়েছিলেন। কেউ এসেছিলেন বাবার বিয়ের পাঞ্জাবি পরে, কেউ পরেছিলেন মায়ের বিয়ের জামদানি শাড়ি। একজন শিক্ষার্থী তাঁর নানির প্রায় ৫০ বছর পুরোনো জামদানি শাড়ি পরে অংশ নেন। বাংলা সাহিত্যের পরিচিত চরিত্র—ব্যোমকেশ বক্সী, দেবদাস, বাকের ভাই, রাণী, রূপা প্রমুখের সাজেও হাজির ছিলেন অনেকে। নারী শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ রাজশাহী সিল্ক, কেউবা টাঙ্গাইল কিংবা জামদানি শাড়ি পরে এসেছিলেন। এই ফ্যাশনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা শুধু নিজেদের সাজাননি, তাঁদের পারিবারিক স্মৃতি, সাহিত্যিক কল্পনা এবং আঞ্চলিক পরিচয়কেও সামনে এনেছেন। একটি পুরোনো জামদানি হয়ে উঠেছে পরিবারের ইতিহাসের অংশ, একটি পাঞ্জাবি পিতার যৌবনের স্মৃতি আর কোনো সাহিত্যচরিত্র প্রজন্মের সাংস্কৃতিক স্মৃতির বাহক।
পোশাকের পাশাপাশি আয়োজনে স্থান পেয়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী খাবার। শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ জেলা থেকে নিয়ে এসেছিলেন বগুড়ার চিনিপাতা দই, কুমিল্লার রসমালাই ও ছানার মুড়কি, টাঙ্গাইলের বাতাসা মিঠাই এবং ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার মণ্ডা। এর সঙ্গে ছিল শিক্ষার্থীদের মায়েদের হাতে তৈরি দুধচিতই, নারিকেলের নাাড়ু, পাটিসাপটা পিঠা, মাংস পিঠাসহ নানা খাবার। ফলে খাবারের টেবিলটি বাংলাদেশের পারিবারিক ও আঞ্চলিক খাদ্যসংস্কৃতির এক ক্ষুদ্র মানচিত্রে পরিণত হয়েছিল।
সাংস্কৃতিক পর্বেও ছিল ঐতিহ্যের ছাপ। দুই নারী শিক্ষার্থী গান পরিবেশন করে দর্শকদের মুগ্ধ করেন। বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বেদের মেয়ে জোসনা’-র একটি অংশ মঞ্চায়ন করেন একদল শিক্ষার্থী। ফলে ধীরে ধীরে আয়োজনটি একটি প্রদর্শনী থেকে পরিণত হয় জীবন্ত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতায়—যেখানে ছবি, পোশাক, সাহিত্য, খাবার, গান ও অভিনয় একই সুতোয় বাঁধা পড়ে।
শেষে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে শিল্পী চন্দ্র শেখর সাহা বলেন, এই অভিজ্ঞতাকে অল্প কথায় প্রকাশ করা কঠিন। তাঁর মনে হয়েছে, অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া প্রত্যেকেই যেন বিশ্বাস করেন—‘আমি কে, আমি কেন বাঙালি’। তিনি ঢাকাকে ঘিরে প্রচলিত হতাশার কথাও উল্লেখ করেন। প্রতিদিনের দুর্যোগ, উদ্বেগ ও নানা সমস্যার ভিড়ে ঢাকা যেন তার প্রাণ হারিয়ে ফেলেছে, কিন্তু এই আয়োজন তাঁকে নতুনভাবে আশাবাদী করেছে। তাঁর ভাষায়, এই অনুষ্ঠান তাঁকে বুঝিয়েছে, এত নেতিবাচকতার মধ্যেও কীভাবে বেঁচে থাকতে হয়। শিক্ষার্থীদের আনা খাবারের মধ্যে তাঁদের মায়েদের প্রতি ভালোবাসা ও আবেগও লুকিয়ে ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। ভবিষ্যতেও আইইউবি এ ধরনের আয়োজনে সবাইকে যুক্ত রাখবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাঙালিয়ানা, মমতা ও ভালোবাসার চর্চা অব্যাহত থাকবে—এমন আশা প্রকাশ করেন তিনি।
আয়োজনের সবচেয়ে বড় অর্জন হয়তো এটিই যে, ঐতিহ্যকে শুধু সংরক্ষণের বিষয় হিসেবে না দেখে তাকে আনন্দ, সৃজনশীলতা ও তারুণ্যের ভাষায় নতুন করে আবিষ্কার করা হয়েছে। একজন শিক্ষার্থীর গায়ে দাদির অর্ধশত বছরের পুরোনো জামদানি, কারও হাতে মায়ের তৈরি পিঠা, কারও বাংলা সাহিত্যের চরিত্র হয়ে ওঠা, আবার কারও কণ্ঠে পুরোনো দিনের গান—সব মিলিয়ে কসপ্লে এখানে আর কেবল সাজসজ্জা থাকেনি, হয়ে উঠেছে নিজের পরিচয়কে নতুন করে জানার এক অভিনব আয়োজন।




