মার্শাল আর্টনির্ভর দৃশ্যে নায়কের শক্তিশালী প্রতিপক্ষ হিসেবে ঢাকাই চলচ্চিত্রে যার পরিচিতি ছিল তুঙ্গে, সেই ইলিয়াস কোবরা এখন তারকাখ্যাতির জগৎ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি সরল গ্রামীণ জীবনে অভ্যস্ত। কক্সটেকনাফের বাহারছড়া ইউনিয়নের নোয়াখালীয়াপাড়ায় নিজ ভিটেয় স্থায়ী হয়েছেন প্রায় পাঁচ শতাধিক ছবির এই খল অভিনেতা।
সম্প্রতি এক বিকেলে স্থানীয় ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’-এর এক দোকানের সামনে প্রথম আলোর প্রতিনিধির সঙ্গে সাক্ষাতে তিনি নিজের চার দশকের চলচিত্র জীবন, গ্রামে ফিরে আসার প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান বাস্তবতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেন। অভিনয়শিল্পী জানান, ‘চলচ্চিত্রে আমি চল্লিশ বছর কাটিয়েছি। এখন আর সেই পেশার প্রতিও কোনো মোহ নেই। শেষ জীবনটা এই গ্রামের পরিবেশেই কাটাতে চাই। কৃষিকাজ, ইবাদত আর মানুষের সেবাটুকুই এখন আমার একমাত্র শান্তি।’
টেকনাফ সদর থেকে বহু দূরে অবস্থিত এই এলাকার বাসিন্দাদের জন্য একদা বাজার ঘাট ছিল এক দুর্ভোগের নাম। স্থানীয় দোকানদার নুরুল ইসলাম স্মরণ করেন, প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে কিংবা নিজের উৎপাদিত ফসল বিক্রি করতে দেড় যোজন পথ পার হয়ে টেকনাফ অভিমুখে যাত্রা করতে হতো গ্রামবাসীকে। সেই দুর্ভোগ লাঘবের লক্ষ্যেই ২০১৫ সালে স্থানীয় অধিবাসীরা অভিনেতার অনুমতি নিয়ে বাজারের নামকরণ করেন ‘ইলিয়াস কোবরা বাজার’। বর্তমানে সেটি পাকা সড়কের দুই পাশ জুড়ে প্রায় ৪৫টি দোকানের একটি জমজমাট বাণিজ্যস্থলে রূপ নিয়েছে। যেখানে স্থানীয় মাছ, শাক, সবজি, পান-সুপারি, নারকেল ও বিভিন্ন মৌসুমি ফলের পসরা বসে।
নিজের নামে বাজার প্রতিষ্ঠার গল্প শোনাতে গিয়ে ইলিয়াস কোবরা বলেন, ‘আমার গ্রামের নাম “নোয়াখালীয়াপাড়া” হওয়ায় বাইরের লোকেরা প্রায়ই বিভ্রান্তিতে পড়তেন। গ্রামবাসীরা আমার কাছে বাজারের জন্য নাম ব্যবহারের অনুমতি চাইলে তাদের আবেগ দেখে আমি রাজি হয়ে যাই। উপস্থিত সবার সামনেই একটি সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়। একটি ছোট মুদিদোকান দিয়ে যাত্রা শুরু করে এখন সেটিই পঁয়তাল্লিশেরও বেশি দোকানে পরিণত হয়েছে। শতবর্ষী গর্জনের বন ও পাহাড়ি ঝরনার টানে দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকরা মাঝপথে বাজারের নাম দেখে থমকে দাঁড়ান এবং তাজা ফলমূল কিনে নিয়ে যান।’
তবে রুপালি পর্দার গ্ল্যামার ত্যাগ করে ফিরলেও তিনি এখানে এক ভিন্ন রকম বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছেন। বাহারছড়ার পাহাড়বেষ্টিত এই অঞ্চলে বিগত কয়েক বছরে মানব পাচার, অপহরণ ও মুক্তিপণ দাবির মতো অপরাধপ্রবণতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছ। গ্রামবাসীদের সঙ্গে কথা বলার সময়ও তিনি এই নিয়েই বেশি উদ্বিগ্ন ছিলেন। ইলিয়াস কোবরার ভাষ্যে, ‘মাঝে মধ্যেই পাহাড়ি সন্ত্রাসীরা নেমে এসে নিরীহ মানুষদের তুলে নিয়ে যায় এবং কয়েকদিন আটকে রেখে টাকা আদায় করে। এটি সবার জন্য এখন এক বিশাল আতঙ্কের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় শতাধিক যুবককে চারটি পৃথক দলে ভাগ করে রাতে পালাক্রমে গ্রাম পাহারা দেওয়ার স্বেচ্ছাসেবী ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে, যা কিছুটা হলেও অপরাধ কমাতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া আইন-শৃঙখলা বাহিনীরও সহযোগিতা অব্যাহত আছে।
১৯৬১ সালের ২০ জানুয়ারি টেকনাফে জন্ম নেওয়া ইলিয়াস কোবরার পুরো নাম মোহাম্মদ ইলিয়াস। চলচ্চিত্রে পদার্পণের আগে তিনি ছিলেন একজন সমাদৃত মার্শাল আর্ট প্রশিক্ষক। ১৯৮৭ সালে নির্মাতা ও নায়ক সোহেল রানার ‘মারুফ শাহ’ ছবির মাধ্যমে তার বড় পর্দায় আবির্ভাব ঘটে। এরপর নয়ের দশকে তিনি রুবেল বা রতন তালুকদারের মতো তারকাদের সাথে পর্দায় টক্কর নেওয়া অন্যতম প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন। অভিনয়ের বাইরে ‘ভাইয়া নাম্বার ওয়ান’ সিনেমাটি প্রযোজনাও করেছেন তিনি। বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির ক্রীড়া ও সংস্কৃতি সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেছেন এবং সর্বশেষ নির্বাচনে সহসভাপতি পদেও নির্বাচিত হয়েছেন।
বর্তমানে তার জীবনের প্রধান পরিচয় এখন সমাজসেবক ও ধর্মপ্রাণ এক ব্যক্তি। সাগরপাড় জামে মসজিদ পরিচালনা কমিটির সভাপতি হিসেবে তিনি মসজিদ পুনর্নির্মাণ, কবরস্থান সম্প্রসারণ এবং একটি ভবিষ্যৎ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছেন। মা, স্ত্রী ও তিন সন্তানকে নিয়ে তার এখানেই বসবাস, তবে স্ত্রী ও ছেলেমেয়েরা প্রয়োজনে ঢাকা ও টেকনাফে যাতায়াত করেন। ইলিয়াস কোবরা পরিস্কার করে দেন, ‘ছোটবেলা থেকে গ্রামের প্রতি আমার অদম্য আকর্ষণ ছিল। ব্যস্ত শিডিউলের ফাঁকেও ছুটে আসতাম। এখন স্থায়ীভাবে থেকে গিয়ে মানুষের সমস্যা শুনি এবং সমাধানের পথ খুঁজি। কোনো কাজ যদি কারও উপকারে লাগে, সেটিকেই আমি জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলে মনে করি।’ একসময় পর্দার নিষ্পাপ মুখোশের আড়ালে ভয়ংকর হয়ে ওঠা মানুষটি এখন গ্রামীণ জীবনের মাটি ও মানুষের কাছেই নিজেকে সঁপে দিয়েছেন।




