ফুটবল বিশ্বকাপের চলমান আসরের উদ্বোধনী দিনে কানাডার মঞ্চে পারফরম্যান্স করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সংগীতশিল্পী সঞ্জয় দেব। ফুটবলের সর্বোচ্চ আসরে অংশ নেওয়া বাংলাদেশি অঙ্গনের তিনিই প্রথম কোনো তারকা। সম্প্রতি একটি পরিবেশনায় অংশ নিতে ঢাকা সফরে এসেছিলেন সঞ্জয়। যুক্তরাষ্ট্রে ফেরত যাওয়ার আগ মুহূর্তে প্রথম আলোর সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর উত্তাল জীবনযাত্রার নানা অধ্যায়, সংগ্রাম এবং আগামী দিনের পরিকল্পনার কথা খুলে বলেন।

বিশ্বকাপের আসরে গান গাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়ে তাঁর মনে ছোটবেলার দিনগুলোর স্মৃতি ভেসে ওঠে। তিনি বলেন, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ তারকা হিসেবে কল্পনা করতেন এবং ডায়েরিতে স্বপ্নগুলো লিখে রাখার অভ্যাসই তাঁর জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়ক হয়েছে। সঞ্জয়ের ভাষায়, জীবনে তিনি কখনও হারেননি—হয় জিতেছেন, অথবা শিখেছেন। এই অদম্য মানসিকতাই তাঁকে এত দূর নিয়ে এসেছে।
স্বপ্ন দেখার সাহস প্রসঙ্গে তিনি সিলিকন ভ্যালির কথা বিশেষভাবে স্মরণ করেন। অ্যাপল ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি ও সমুদ্রতীরবর্তী ওই অঞ্চলের স্বপ্নবান মানুষগুলোই তাঁর অভীপ্সাকে শাণিত করে। পরিবারের আর্থিক কষ্ট দূর করার ব্রত থেকেই তিনি নিজেকে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন। তাঁর মা ও নানি সংগীতচর্চা করতেন এবং পারিবারিক গানের আসরে তিনি তবলা বাজাতেন। পরবর্তীতে দ্বাদশ জন্মদিনে এক আত্মীয়ের দেওয়া ল্যাপটপ ও একটি সংগীত প্রযোজনার সফটওয়্যার তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়, এবং একক শিল্পী বা ‘ওয়ান ম্যান ব্যান্ড’ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পেতে শুরু করে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর পরিধেয় জ্যাকেটটি ছিল বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এতে বাংলার বাঘ, জাতীয় ফুল শাপলা এবং লাল-সবুজ পতাকার মোটিফ ছিল। সঞ্জয়ের বিশ্বাস, এই মঞ্চটি ছিল সারা দুনিয়ার কাছে বাংলাদেশকে চেনার একটি মাধ্যম। তিনি ইংরেজি গান করলেও নিজের শিকড়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘ ২৫ বছর ধরে বসবাসরত এই অভিবাসী শিল্পী তাঁর সংগ্রামী অধ্যায়ের কথাও স্মরণ করেন। শুরুতে খারাপ মানের মিউজিক প্রোডিউস করলেও সংগীতের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসাই তাকে থামতে দেয়নি। লস অ্যাঞ্জেলেসে গিয়ে বাসা ভাড়া দেওয়ার সামর্থ্যও ছিল না তার; একটি ফ্লোরেই রাত কাটাতেন। জীবিকা নির্বাহের জন্য তিনি নিজের তৈরি করা মিউজিক বিটস ১০০ থেকে ১৫০ ডলারে বিক্রি করতেন। ভাড়ার টাকা বাঁচিয়ে সঞ্চিত অর্থ তিনি সংগীতের পেছনে খরচ করতেন। আজ ফিরে তাকালে সেই কঠিন যাত্রাপথকে তিনি অসাধারণ বলে মনে করেন এবং সংগীতের প্রতি সেই নিবিড় ভালোবাসা এখনও অম্লান রয়েছে।
ভবিষ্যতে যদি আন্তর্জাতিক কোনো বড় প্ল্যাটফর্মে বাংলা গান গাওয়ার সুযোগ আসে, তাহলে তাঁর নিজের তৈরি করা ‘কার জন্য করিলা মায়া’ গানটি শোনাতে চান। এই গানের মাধ্যমে তিনি বিশ্ববাসীকে বাংলাদেশকে চেনাতে আগ্রহী।
শোনার পছন্দের গান বিষয়ে সঞ্জয় জানান, ঘুম থেকে ওঠার পর নুসরাত ফতেহ আলী খানের গান ও রবিশঙ্করের দীর্ঘ বাদন তাঁকে বিমোহিত করে। অনেকেই হয়তো ভাবতে পারেন যে তিনি কেবল ক্লাব সংগীতে মেতে থাকেন, কিন্তু বাস্তবে তার শ্রুতির জগৎ আরও বিস্তৃত ও গভীর।
সাফল্য মানুষকে বদলায় কি না, এই প্রশ্নের জবাবে সঞ্জয় বলেন, তার কাছে সফলতার সংজ্ঞা ভিন্ন। মানুষকে আনন্দ দেওয়া, ভালোবাসা ছড়িয়ে দেওয়া ও অসাধারণ সংগীত প্রযোজনা করাকেই তিনি সাফল্য মনে করেন এবং এগুলো সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া উপহার যা তিনি বিলিয়ে চলেছেন। দশ বছর পর নিজের অবস্থান প্রসঙ্গে সঞ্জয়ের মন্তব্য, শুনতে অদ্ভুত লাগলেও তত দিনে তিনি অস্কার ও গ্র্যামি পুরস্কার বাংলাদেশে নিয়ে আসতে চান।