পবিত্র মদিনা নগরী থেকে ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম গৌরবময় অধ্যায় বদর প্রান্তরের উদ্দেশে এক সফরের স্মৃতিচারণ এটি। ফজরের নামাজ শেষে মসজিদে নববির সবুজ গম্বুজের পরিবেশ পেছনে ফেলে লেখক ও তার বন্ধু সাইমন যাত্রা করেন সেই ভূমিতে, যেখানে ১৪০০ বছর আগে রচিত হয়েছিল সত্য-মিথ্যার ফায়সালার মহাকাব্য। মদিনার কোলাহল থেকে বেরিয়ে আসতেই আধুনিক মহাসড়কের নিস্তব্ধতা তাদের ঘিরে ধরে। দুই পাশে অন্তহীন মরুভূমি, শুষ্ক পাহাড়, আর দিগন্তের সঙ্গে মিশে যাওয়া পথ। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে বসে মনে পড়ে যায় সেই সময়ের কথা, যখন মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও তার সাহাবিরা উটের পিঠে বা হেঁটে এই একই পথ পাড়ি দিয়েছিলেন, উত্তপ্ত ও প্রতিকূল পরিবেশে।
হিজরি দ্বিতীয় সনের রমজান মাসের ১৭ তারিখে সংঘটিত বদরের যুদ্ধ ছিল মুসলমানদের জন্য নিছক একটি সামরিক অভিযান নয়, বরং এটি ছিল অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। একজন বিশ্বাসী ও এক হাজার কাফিরের মধ্যে ভারসাম্যহীন এই যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর সদস্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩১৩ জন, অস্ত্রশস্ত্রও ছিল অপ্রতুল। অল্প কয়েকটি ঘোড়া ও প্রায় ৭০টি উট ছিল, যেগুলো একাধিক ব্যক্তি পালাক্রমে ব্যবহার করতেন। বিপরীতে মক্কার কুরাইশ বাহিনী ছিল সুসজ্জিত, বিশাল অশ্বারোহী সেনা ও পর্যাপ্ত রসদ নিয়ে। কিন্তু মানবিক বিবেচনা যেখানে মুসলমানদের পরাজয় নিশ্চিত করছিল, সেখানেই ঐশী সাহায্যে নেমে আসে। এই যুদ্ধ পবিত্র কোরআনে ‘ইয়াওমুল ফুরকান’ নামে অভিহিত হয়েছে, অর্থাৎ সত্য ও মিথ্যার মধ্যে পার্থক্যকারী দিন। এই একটি পরিভাষাই গোটা ঘটনার মাহাত্ম্য বোঝাতে যথেষ্ট।
বদরের আধুনিক, শান্ত ও পরিচ্ছন্ন শহরে পৌঁছে প্রথম যে অনুভূতি হয় তা ভাষায় প্রকাশের অতীত। লেখক বর্ণনা করেছেন, চোখ বন্ধ করলেই যেন সেই ঐতিহাসিক দৃশ্যগুলো ভেসে ওঠে— যেথায় প্রিয় নবী করিম (সা.) তার সাহাবিদের নিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে কাকুতি-মিনতি করেছিলেন। ইমস্রোলার আল্লামা সফিউর রহমান মুবারকপুরী তার বিখ্যাত গ্রন্থ 'আর-রাহীকুল মাখতূম'-এ তুলে ধরেছেন, মূলত আবু সুফিয়ানের বাণিজ্য কাফেলার দিকে লক্ষ্য করে যাত্রা শুরু করলেও পরিস্থিতি পাল্টায় এবং কুরাইশ বাহিনীর সরাসরি সম্মুখ সমরে অবতীর্ণ হয়। যুদ্ধের আগে রাসূলুলাহ (সা.) তার সঙ্গীদের সঙ্গে পরামর্শ করেন এবং আনসার সাহাবি সা'দ ইবনে মুআজ (রা.)-এর জোরালো প্রত্যয় ও আনুগত্যের ঘোষণা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে আছে। একইভাবে সাহাবি হুবাব ইবনে মুনযির (রা.)-এর কৌশলগত পরামর্শকে রাসুল (সা.) গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করায় এক আদর্শ নেতৃত্বের শিক্ষা পাওয়া যায়।
যুদ্ধপূর রাত্রিতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বর্ষিত বৃষ্টি বালুময় জমিকে শক্ত করেছিল এবং মুমিনদের মনে প্রশান্তি দিয়েছিল। বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্থানটি সংরক্ষিত র মধ্যে, যেখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় যেন সমগ্রাত থমকে আছে। শহিদ সাহাবিদের স্মৃতিফলকেরা তাদের নাম খোদাই করা রয়েছে, আর প্রতিটি নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা আত্মত্যাগের কথা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেখানকার কেন্দ্রীয় মসজিদে নামাজ পড়ে লেখক দেখেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আসা মুসল্লিদের ভিড়, যা প্রমাণ করে বদরের শিক্ষা সর্বকালিন ও বৈশ্বিক। শহরটি বর্তমানে মদিনা অঞ্চলের একটি সরল জনপদ, যার খেজুরবাগান ও ছোট্ট বাজার তার গাম্ভীর্য বা ত্যাগের। ফেরার পথে একটি ঐতিহাসিক কূপ থেকে পানি পান করেন তারা, যাকে স্থানীয়রা বরকতের প্রতীক মনে করে। ফিরতি পথে সূর্যাস্তের সোনালি আলো মরুভূমির পাহাড়গুলোকে রঞ্জিত করে। লেখক উপল ব্ধি করেন, বদরের সফর কোন সাধারণ ভ্রমণ নয়, এটি এক অন্তর্লোকে যাত্রা। বদরের ইতিহাস কোনো সেনা বিজয়ের শুষ্ক বিবরণ নয়; এটি হলো আত্মবিশ্বাস, পরামর্শ, ত্যাগ ও ঐশ্বরিক সাহায্যের এক চিরজীবিত প্রতীক। সত্যের পথে চলার জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা নয়, প্র্রয়োজন অটল ঈমান ও বিশ্বাস—এটাই এই ভূমির নীরব বার্তা।




