পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন প্রসঙ্গে পাখির কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে ‘তাইর’ (একবচন) শব্দটি ৫ বার এবং ‘তুয়ূর’ (বহুবচন) শব্দটি ১৩ বার এসেছে। এই বৈচিত্র্যময় পাখিজগতের ভেতর একটি বিশেষ পাখির নাম স্পষ্টভাবে কোরআনে উচ্চারিত হয়েছে, যার নাম ‘হুদহুদ’। সুরা নামলে এই পাখিটির নাম ও তার এক অসাধারণ ভূমিকা নিয়ে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বিশদভাবে বর্ণিত হয়েছে। নবী সুলাইমান (আ.)-এর সাম্রাজ্য এবং ইয়েমেনের সাবা রাজ্যের চমকপ্রদ রূপান্তরের নেপথ্যে একটি ছোট্ট পাখির এই অবদান সত্যিই বিস্ময়কর।
জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হুদহুদ পাখি প্রকৃতির এক অদ্ভুত সুন্দর ও বুদ্ধিমান প্রাণী। ইংরেজিতে একে হুপো (Hoopoe) বলা হয় এবং এর বৈজ্ঞানিক নাম ইউপুপা এপপ্স (Upupa epops)। পাখিটির বিশেষ ডাক ‘হুপ-হুপ’ বা ‘হুদ-হুদ’ শব্দের অনুকরণেই এর এই নামকরণ হয়েছে। আরবি অভিধানে বর্ণিত আছে, এটি মাথায় ঝুঁটি বিশিষ্ট এক পরিচিত পাখি, যা ‘হুপ-হুপ’ শব্দে ডাকে এবং ভূগর্ভস্থ পানির উপস্থিতি আঁচ করতে পারে। মাথায় পাখার মতো আকর্ষণীয় ঝুঁটি থাকায় বাংলা ভাষায় এটিকে মোহনচূড়া পাখি বলা হয়। এই পাখি সাধারণত এশিয়া, ইউরোপ এবং উত্তর আফ্রিকার ক্রান্তীয় ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে বিচরণ করে। এদের দূরদর্শিতা এবং মাটির নিচের সূক্ষ্ম বস্তু বা পানির উৎস টের পাওয়ার বিশেষ ক্ষমতা আছে বলে মনে করা হয়।
নবী সুলাইমান (আ)-এর যুগে হুদহুদ পাখি ছিল তার সুবিশাল সেনাবাহিনীর অংশ। এই সেনাদলে মানুষ, জিন ও পাখিকুল অন্তর্ভুক্ত ছিল। দ্রুত উড়ার ক্ষমতা ও দূরবর্তী স্থানের খবর সংগ্রহ করতে পারার দক্ষতার জন্য পাখিদেরকে মূলত বার্তা বাহন ও বিশেষ পর্যবেক্ষণ কিংবা গোয়েন্দা তৎপরতার কাজে নিযুক্ত করা হতো। একদিন নবী সুলাইমান (আ.) তার পাখিদের পরিদর্শন করছিলেন। এ সময় তিনি হুদহুদকে তার নির্দিষ্ট জায়গায় দেখতে না পেয়ে আশ্চর্য হন এবং বলে ওঠেন, “কী ব্যাপার, আমি হুদহুদকে দেখছি না কেন? নাকি সে অনুপস্থিত?” একজন কঠোর শাসক হিসেবে তিনি এই অনুপস্থিতির সদুত্তর না পেলে কঠোর শাস্তির ঘোষণাও দিয়েছিলেন।
কিছুক্ষণের মধ্যেই হুদহুদ ফিরে আসে এবং কোনো ভয় না পেয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলে, “আমি এমন একটি বিষয় জানতে পেরেছি যা আপনি জানেন না। আমি ইয়েমেনের ‘সাবা’ রাজ্য থেকে আপনার জন্য একটি নিশ্চিত ও সত্য সংবাদ নিয়ে এসেছি।” এরপর হুদহুদ সাবার এক নারী শাসক রানি বিলকিসের প্রসঙ্গ তোলে। সে জানায়, তিনি বিপুল ঐশ্বর্ধ্য ও জাঁকজমকপূর্ণ সিংহাসনের অধিকারী হলেও দুঃখের বিষয় হল, তিনি ও তার প্রজারা এক অদ্বিতীয় আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্যের উপাসনা করে। শয়তান তাদের এ বিভ্রান্তিকর পথকে আকর্ষণীয় করে দেখিয়েছে। সুলাইমান (আ.) হুদহুদের কথার সত্যতা যাচাই করার জন্য একটি চিঠি রানির প্রাসাদে পৌঁছে দেওয়ার ও আড়াল থেকে প্রতিক্রিয়া জানার নির্দেশ দেন। এভাবেই একটি ক্ষুদ্র পাখির মাধ্যমেই একটি গোটা সাম্রাজ্য সত্যের সন্ধান পাওয়ার সুযোগ পায়।
আধুনিককালের কিছু বিশ্লেষকের দাবি, ‘হুদহুদ’ কোনও পাখি নয়, বরং সুলাইমান (আ.)-এর কোনো মানব গোয়েন্দা এই নামে পরিচিত ছিল। কারণ একটি সাধারণ পাখির পক্ষে নারীর শাসন, রাজনৈতিক অবস্থা বা গভীর ধর্মীয় দর্শন বোঝা কঠিন বলে তারা যুক্তি দেন। কিন্তু আলেমরা এই বক্তব্য খণ্ডন করেছেন। মহান আল্লাহ স্পষ্ট বলেছেন, তিনি নবী সুলাইমানকে পশুপাখির ভাষা ও অনুভূতি বোঝার বিশেষ মুজিজা দিয়েছিলেন। এছাড়া, বর্তমান প্রাণিবিজ্ঞানও প্রমাণ করে যে, অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও তীব্র বুদ্ধি, পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা বিদ্যমান। কাজেই স্রষ্টার দেওয়া বিশেষ প্রজ্ঞায় এই পাখি অন্য রাজ্যের রাজনীতি ও ধর্ম সম্পর্কে তথ্য পরিবেশন করবে, এতে অবিশ্বাসের কিছু নেই।
ঘটনাটি থেকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, জ্ঞান ও সত্যের সন্ধান যেকোনো স্থান বা মাধ্যমের কাছ থেকেই গ্রহণ করা চলে; সেখানে মাধ্যমটির আকার বিবেচ্য নয়, বরং বার্তার সত্যতা মুখ্য। তেমনি নবী সুলাইমানের মতো প্রভাবশালী এক বাদশাহও একটি পাখির যুক্তিপূর্ণ কথাল শুনে তা যাচাই করলেন, যা শাসক ও সুশীলদের বিনয়ী ও দায়িত্বশীল হতেও শিক্ষা দেয়। হুদহুদের এই কাহিনি প্রমাণ করে, মহান আল্লাহর সৃষ্টির প্রতিটি উপাদান, তা যত ক্ষুদ্রই হোক, একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য ও অসীম প্রজ্ঞা নিয়ে দুনিয়ায় বিদ্যমান।




