ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী হলগুলোর সান্ধ্য বিধিনিষেধ তুলে দেওয়ার দাবিতে সোমবার বিকেলে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সংহতি সমাবেশ করেছে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘অবরোধবাসিনী’। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে তিন দফা দাবি পূরণের জন্য ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেওয়া হয়। প্ল্যাটফর্মের নেতারা সতর্ক করে বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবি না মানলে পরবর্তী কর্মসূচি আরও কঠোর হবে।
সমাবেশে শিক্ষার্থীদের এই আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে অংশ নেয় একাধিক সংগঠন। রোকেয়া হল কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি নিবেশ (রোসনি), রেড ফেমিনিস্ট ব্লক, নারী পক্ষ, নারী অঙ্গন, বিপ্লবী নারী মুক্তি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশন, বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট, বিপ্লবী ছাত্র যুব আন্দোলন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফোকলোর সোসাইটি, ফিল্ম সোসাইটি, সাহিত্য সোসাইটিসহ সাংস্কৃতিক সংগঠন স্বরধ্বনি সমাবেশে সংহতি জানায়।
‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষ থেকে বক্তব্য দেন বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর সাংগঠনিক সম্পাদক ইসরাত জাহান ইমু। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী হলগুলোতে রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত যাতায়াতের ওপর যে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাতে জরুরি মুহূর্তে শিক্ষার্থীদের প্রশাসনিক জটিলতায় পড়তে হয়। তিনি ২০১৫ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করে বলেন, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলে এক ছাত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ও প্রক্রিয়া শেষ করতে না পারায় চিকিৎসার অভাবে হলের ভেতরেই মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মতে, এ ধরনের ঘটনা সান্ধ্য আইন বাতিলের প্রয়োজনীয়তাই স্পষ্ট করে।
সমাবেশে ‘অবরোধবাসিনী’র পক্ষ থেকে তিনটি দাবি উপস্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— ছাত্রী হলগুলোতে বৈষম্যমূলক সান্ধ্য আইন বাতিল করে ২৪ ঘণ্টা চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, বৈধ আইডি কার্ড প্রদর্শন করে যেকোনো হলে ছাত্রীদের প্রবেশ ও থাকার সুযোগ দেওয়া এবং নারী অভিভাবকদের হলে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া।
সমাবেশে নারীপক্ষের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য শিরীন পারভীন হক বলেন, ২৫ থেকে ৩০ বছর আগেও তিনি ও তাঁর সহকর্মীরা ছাত্রী হলের সান্ধ্য আইনের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। তখন সন্ধ্যা ৬টার বিধিনিষেধ পরিবর্তন করে রাত ১০টা পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে সময়সীমা কিছুটা বাড়াতে পেরেছিলাম, কিন্তু মূল বৈষম্যটি দূর করতে ব্যর্থ হয়েছিলাম। বর্তমান প্রজন্ম সরাসরি এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে, যা সত্যিই অভিনন্দনযোগ্য।’
আলোকচিত্রী ও বাংলাদেশের সাম্যবাদী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত জান্নাতুল মাওয়া বলেন, ২০২৬ সালেও নারীদের চলাচলের ওপর এ ধরনের বিধিনিষেধ থাকা অত্যন্ত হতাশাজনক। তিনি বলেন, নারী পরিচয়ের কারণে, শুধুমাত্র লিঙ্গগত কারণে ২০২৬ সালেও তাঁকে বৈষম্যের শিকার হতে হবে— এটি তিনি কল্পনাই করতে পারেন না।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুশাদ ফরীদি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকে সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর আগস্টে একটি নতুন স্বাধীনতার সূচনা হয়েছিল। সেই বাংলাদেশেও এখনো এ ধরনের বৈষম্যমূলক ও বন্দিত্বমূলক আইন বহাল থাকা শিক্ষক হিসেবে তাঁদের জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক।
সমাবেশে আরও উপস্থিত ছিলেন মায়ামি ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ফৌজিয়া আহমেদ, রেড ফেমিনিস্ট ব্লকের সদস্য তানহা মাহমুদ, নারীপক্ষের সদস্য ওয়ারদা আশরাফ প্রমুখ।




