দেশের ব্যাংক খাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন আইন ও নীতিমালার খসড়ায় সম্মতি দিয়েছে মন্ত্রিসভা। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার ১৬তম বৈঠকে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’, ‘ভিসা নীতিমালা, ২০২৬’ এবং ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার নীতিগত ও চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্তগুলোতে ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা, অভিবাসন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং মানবাধিকার সুরক্ষায় নতুন দিকনির্দেশনা উঠে এসেছে।
তফসিলি ব্যাংকগুলোর মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট কিংবা দেউলিয়াত্ব—এ ধরনের যেকোনো ঝুঁকি সময়মতো মোকাবিলা এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে আগে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে অধ্যাদেশটি আইনে রূপান্তরের লক্ষ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিল আকারে উত্থাপন করা হলে তা পর্যালোচনার জন্য সংসদীয় বিশেষ কমিটির কাছে যায়। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে প্রস্তাবিত আইনটি পরীক্ষা করে বিশেষ কমিটি সংশোধিত আকারে উপস্থাপনের সুপারিশ করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতে কিছু বিধান বিধিমালার মাধ্যমে বাস্তবায়নের জন্য পৃথক করা হয় এবং সরকারের আর্থিক দায়, গ্রাহক স্বার্থ ও ব্যাংক খাতের বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন ধারা ১৮ক সংযোজন করে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬’ পাস হয়। তবে প্রচলিত রেজোল্যুশন ব্যবস্থার পাশাপাশি বাজারভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা চালু, সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংককে সচল রেখে পুনর্গঠন, মূলধন ঘাটতি ও তারল্যসংকট দূরীকরণ, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষা এবং সরকারের আর্থিক সংশ্লেষ কমানোর লক্ষ্যে যুক্ত করা ১৮ক ধারার সব শর্ত পরিপালন করে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় ধারাটি বিলুপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যেই ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া তৈরি করা হয়েছে।
বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশে আসা-যাওয়া সহজ করতে এবং বিদেশি বিনিয়োগ, ব্যবসা ও দক্ষ মানবসম্পদ আকৃষ্ট করতে নতুন ‘ভিসা নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। পর্যটন ও আতিথেয়তা খাতকে উৎসাহিত করা, প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তর নিশ্চিত করা, জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখা এবং পারস্পরিকতা নীতির ভিত্তিতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে এই নীতিমালা তৈরি করা হয়েছে। বিদ্যমান ভিসা পদ্ধতিকে যুগোপযোগী ও নিরাপদ করতে নতুন নীতিমালায় ৩৪টি ভিসা ক্যাটাগরি নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের ৩৩টি ক্যাটাগরির চেয়ে বেশি। ফলে আগের সব ভিসাসংক্রান্ত সার্কুলার বাতিল করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বহির্গমন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর এবং বিদেশের বাংলাদেশি মিশনগুলো সমন্বিতভাবে এই নীতিমালা বাস্তবায়ন করবে।
একই বৈঠকে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০২৬’-এর খসড়াতেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও নিশ্চিতকরণের জন্য একটি কার্যকর ও স্বাধীন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে এই আইন প্রণয়ন করা হচ্ছে। আইনটিতে একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনার নিয়ে কমিশন গঠনের বিধান রাখা হয়েছে, যেখানে অন্তত একজন নারী সদস্য থাকবেন। কমিশন গঠনে বাছাই কমিটির সুপারিশে নৃগোষ্ঠী ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর যোগ্য প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিধানও যুক্ত হয়েছে। বাছাই কমিটিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, নাগরিক প্রতিনিধি এবং নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধি থাকবেন। কমিশনের কার্যপরিধি সুস্পষ্ট করা ছাড়াও অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্ত প্রক্রিয়া সহজ করা হয়েছে। তদন্ত চলাকালে ভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে কমিশনকে অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী সনদের ‘ঐচ্ছিক প্রটোকল’ অনুযায়ী হেফাজতে নির্যাতন, মৃত্যু বা গুম রোধে জাতীয় প্রতিরোধব্যবস্থা ইউনিট গঠনের বিধানও এই আইনে রাখা হয়েছে।




