২০১১ সালে টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার এলাকায় র‌্যাবের চালানো এক অভিযানে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় এক ব্যক্তিকে মাথায় গুলি করে সেতু থেকে পানিতে ফেলে দেওয়ার ঘটনা ঘটে বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ সোমবার জবানবন্দি দিয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. রফিকুল ইসলাম। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শতাধিক ব্যক্তিকে গুম ও হত্যার অভিযোগে মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার সাক্ষী হিসেবে এই জবানবন্দি প্রদান করেন। বর্তমানে আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের উপপরিচালক হিসেবে কর্মরত রফিকুল ইসলাম তার জবানবন্দিতে বলেন, র‌্যাব-৩-এর অধিনায়ক থাকাকালীন ২০১১ সালের ১১ জুলাই র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার তৎকালীন পরিচালক জিয়াউল আহসান তাকে ফোন করে জানান, রাতে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে যেতে হবে এবং অফিসারদের নিয়ে প্রস্তুত থাকতে বলবেন। জিয়াউলের কাছ থেকে অভিযানের বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি জানান, কোনো প্রশ্ন না করে তার আদেশ অনুযায়ী কাজ করতে হবে।

রাত সাড়ে ১০টার দিকে মেজর সাজ্জাদুল, মেজর তরিকুল ও মেজর এমারতকে নিয়ে র‌্যাব সদর দপ্তরে উপস্থিত হন রফিকুল ইসলাম। পরে জিয়াউল আহসান সেখানে এসে তাকে অনুসরণ করতে বলেন এবং চারটি গাড়িতে করে তারা টঙ্গীর আহসানউল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভারের দিকে রওনা হন। ফ্লাইওভার থেকে নেমে ডান দিকে মোড় নিয়ে প্রায় ৪০ মিনিট行进র পর একটি সেতুতে গাড়িগুলো থামে। সেতুর ওপরে জিয়াউল ঘোষণা করেন সেখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে। এরপর রফিকুল ইসলাম দেখতে পান, একটি গাড়ি থেকে হাত-মুখ বাঁধা একজনকে নামিয়ে সেতুর রেলিংয়ের পাশে দাঁড় করানো হয় এবং জিয়াউল আহসান সেই ব্যক্তির মাথায় গুলি করে তাকে পানিতে ফেলে দেন।

সেখান থেকে সামনে এগিয়ে ৪ থেকে ৫ মিনিট পর আরেকটি সেতুতে গাড়ি থামে। সেখানে হাত-চোখ বাঁধা আরেকজনকে নামিয়ে আনা হলে জিয়াউল মেজর সাজ্জাদুলকে দ্বিতীয় অপারেশনটি চালানোর নির্দেশ দেন। সন্ত্রাসী কে এবং কেন এই অপারেশন তা জানতে চাইলে জিয়াউল তাকে আদেশ মানতে বলেন। সাজ্জাদুল অপারেশনে অপারগতা প্রকাশ করলে জিয়াউল তাকে 'কাওয়ার্ড' ও 'স্টুপিড' বলে গালমন্দ করেন এবং তাকে গাড়িতে বসে থাকতে বলেন। এরপর জিয়াউল রফিকুল ইসলামকে মেজর সাজ্জাদুলের কাছে গিয়ে পরিস্থিতি দেখতে নির্দেশ দেন। রফিকুল ইসলাম গাড়ির দিকে যাওয়ার সময় একটি গুলির শব্দ শুনতে পান। এরপর আবার গাড়িগুলো সামনে এগোলে ৮ থেকে ১০ মিনিট পর রাস্তার বাঁ পাশে থামে। সেখানে তিনি দেখতে পান, চোখ-হাত বাঁধা একজনকে দুইজন ব্যক্তি রাস্তার ডান পাশের বাঁশঝাড়ের দিকে নিয়ে যাচ্ছেন এবং কয়েক মিনিট পর একটি গুলির শব্দ শোনা যায়।

গাড়িতে ফেরার পর মেজর তরিকুল তাকে জানান, জিয়াউল আহসান তাকে একজনকে মারতে বলেছিলেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তবে জিয়াউলের সঙ্গের দুজন ব্যক্তি সেই ব্যক্তিকে হত্যা করে। এ ঘটনায় জিয়াউল তাকেও গালমন্দ করেন। পরে গাড়িগুলো ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে তাদের বাসায় নামিয়ে দেয়। পরদিন অফিসে গিয়ে তিনি মেজর সাজ্জাদুলের সেনাবাহিনীতে প্রত্যাবর্তনের আদেশ পান। পরে গণমাধ্যমে জয়দেবপুর এলাকায় গুলিবিদ্ধ দুই থেকে তিনজনের মৃতদেহ উদ্ধারের খবর জানতে পারেন বলেও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন রফিকুল ইসলাম। এই মামলার একমাত্র আসামি জিয়াউল আহসান বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং জবানবন্দির সময় তিনি ট্রাইব্যুনালের এজলাসে উপস্থিত ছিলেন।